কুষ্টিয়া প্রতিনিধি :-
মোঃ আশরাফ ইকবাল পিকলু মাজমাদার।
কুষ্টিয়ায় নবজাতকের হাত ভাঙার অভিযোগ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। ওই চিকিৎসক ডা.নাজনীন আক্তার জাহানকে ঘিরে নবজাতকের চিকিৎসায় গুরুতর অবহেলা ও তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। ডা.নাজনীন আক্তার জাহান কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের গাইনি ও অবস কনসালটেন্ট হিসেবে কর্মরত। পাশাপাশি তিনি কুষ্টিয়ার সনো ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়মিত রোগী দেখেন বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে নবজাতকের এক স্বজন অভিযোগ করেছেন,সিজারিয়ান অপারেশনের সময় ডা.নাজনীন আক্তার জাহানের ভুলের কারণে শিশুটির একটি হাত তিন জায়গায় ভেঙে যায়। কিন্তু বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি।
স্বজনের দাবি,তাদের জানানো হয়েছিল শিশুটির হার্টে সমস্যা হয়েছে এবং দ্রুত রাজশাহীতে নিয়ে যেতে হবে। সেই অনুযায়ী কুষ্টিয়া থেকে শিশুটিকে রাজশাহীতে নেওয়া হয়। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন,শিশুটির হার্টে কোনো সমস্যা নেই। বরং সিজারিয়ান অপারেশনের সময় শিশুটির হাতে গুরুতর আঘাতের ঘটনা ঘটেছে বলে পরিবারের দাবি।
শিশুটির স্বজনের আরও অভিযোগ, রাজশাহীতে নেওয়ার আগে একটি হাসপাতালে শিশুটিকে রাতভর রাখা হয় এবং পরে হার্টের সমস্যার কথা বলে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এতে শিশুটির শারীরিক অবস্থা আরও জটিল হয়েছে বলেও তারা দাবি করেছেন।
একজন চিকিৎসকের হাতে চিকিৎসাজনিত জটিলতা তৈরি হতে পারে। অপারেশনের সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটতে পারে। কিন্তু কোনো গুরুতর জটিলতা দেখা দিলে রোগী বা তার স্বজনদের কাছে সেটি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল কি না,সেটিও চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যদি সত্যিই সিজারিয়ান অপারেশনের সময় শিশুটির হাত ভেঙে গিয়ে থাকে এবং সেটি পরিবারের কাছ থেকে গোপন করা হয়ে থাকে,তাহলে প্রশ্ন উঠবেই,বিষয়টি কেন জানানো হয়নি ?
আর যদি শিশুটির হার্টের সমস্যা না থাকা সত্ত্বেও তাকে হার্টের রোগী হিসেবে অন্যত্র পাঠানো হয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের চিকিৎসাগত ভিত্তি কী ছিল?
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অভিযোগকারী পরিবার ইতোমধ্যে শিশুটিকে নিয়ে রাজশাহীর একটি হাসপাতালের NICU-তে চিকিৎসা নিচ্ছে বলে জানিয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি এখন শুধুমাত্র একটি ফেসবুক পোস্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুটির চিকিৎসা নথি,এক্স-রে,অপারেশন নোট,হাসপাতালের রেকর্ড এবং পরবর্তী চিকিৎসকদের মতামত যাচাই করলেই অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব।
তবে একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে,সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো চিকিৎসককে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। ডা.নাজনীন আক্তার জাহানের বক্তব্যও জানা প্রয়োজন। তার অপারেশনের নথি,চিকিৎসা সিদ্ধান্ত এবং শিশুটির শারীরিক অবস্থার বিষয়ে তিনি কী ব্যাখ্যা দেন,সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু অভিযোগটি যদি তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়,তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। কারণ এটি শুধু একটি চিকিৎসাগত ভুলের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন নবজাতকের শারীরিক ক্ষতি,একটি পরিবারের মানসিক যন্ত্রণা এবং চিকিৎসকের প্রতি মানুষের আস্থার প্রশ্ন।
তাই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নয়,প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত।
স্বাস্থ্য বিভাগ,হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান চাইলে চিকিৎসা নথি পর্যালোচনা করে ঘটনার প্রকৃত কারণ বের করতে পারে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া যেতে পারে।
একজন চিকিৎসক ভুল করলে তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়া যেমন প্রয়োজন,তেমনি কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও প্রমাণ ছাড়া সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা উচিত নয়।
এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি কিন্তু চিকিৎসক কিংবা স্বজন নন,সেই নবজাতক শিশুটি। তার হাতের ভবিষ্যৎ কী হবে,তার চিকিৎসা কতটা কার্যকর হবে এবং কীভাবে সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে,সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
এর পাশাপাশি পরিবারের যে অভিযোগ ও প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে,সেগুলোরও উত্তর প্রয়োজন।
সত্যিই যদি ভুল হয়ে থাকে,কেন হলো?
আর যদি ভুল না হয়ে থাকে,তাহলে শিশুটির হাতে এমন গুরুতর আঘাতের কারণ কী?
আর কোনো জটিলতা তৈরি হয়ে থাকলে পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়েছিল কি না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আবেগ দিয়ে নয়,চিকিৎসা নথি ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পাওয়া উচিত।
আর তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে এই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কতৃপক্ষের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এটাই প্রত্যাশা।
Leave a Reply