
মোঃ হারুন চৌধুরী, স্টাফ রিপোর্টার,কুষ্টিয়া।
পরিবারের স্নেহবঞ্চিত, সমাজ ও পৃথিবীর কাছে অচেনা এক দশ বছর বয়সি শিশু ইউসুফ। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও সে পেল না কোনো রক্তমাসের আপনজনের ছোঁয়া। তবে মৃত্যুর আগে শেষ ৪২টি দিন সে পেয়েছিল এক পশলা স্বস্তির ছায়া ও অকৃত্রিম ভালোবাসার ঠিকানা—চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ‘বেওয়ারিশ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র’ (বেওয়ারিশ হাসপাতাল)। দীর্ঘ ৪২ দিন মরণব্যাধির সাথে লড়াই করে অবশেষে গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ) না ফেরার দেশে চলে গেছে অবুঝ শিশু ইউসুফ। তার এই প্রস্থান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে।
ঘটনার শুরু হয়েছিল চট্টগ্রামের একটি স্থানীয় মসজিদের সামনে থেকে। পরিবারহীন, অবহেলিত ও মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে সেখানে পড়েছিল শিশু ইউসুফ। ক্ষুধার জ্বালা, অসুস্থতা আর সমাজের চরম অবহেলায় তিল তিল করে ক্ষয়ে যাচ্ছিল তার শিশুজীবন।
খবর পেয়ে মানবতার টানে এগিয়ে আসেন ‘বেওয়ারিশ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী শওকত আরশাদ (যিনি ‘মানবিক শওকত’ নামে পরিচিত)। তিনি শিশুটিকে উদ্ধার করে দ্রুত নিজের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে নিয়ে আসেন চিকিৎসার জন্য। উদ্ধার করার পর চিকিৎসকরা শিশুটির শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে হতবাক হয়ে যান। তারা দেখতে পান, ইউসুফের শরীরের নিচের অংশ বা নিতম্বে মারাত্মক পচন ধরেছে। পরবর্তীতে আরও উন্নত পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, সেই পচন ধরা স্থানে বাসা বেঁধেছে মরণব্যাধি ক্যান্সার। চিকিৎসকরা জানান, রোগটি এমন এক পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তার আর সুস্থ হয়ে ওঠার কোনো অবকাশ ছিল না।
চিকিৎসকদের এই নির্মম সত্য জানানোর পরও থেমে থাকেনি মানবিক শওকত ও তার গড়া প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছাসেবীদের ভালোবাসা। ক্যান্সার আক্রান্ত ইউসুফকে তারা পরম মমতায় আগলে রাখেন দীর্ঘ ৪২টি দিন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই দিনগুলোতে শিশুটির মনের যেকোনো আবদার পূরণ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সে যা খেতে চেয়েছিল বা যা চেয়েছিল, স্বেচ্ছাসেবীরা পরম যত্নে তা তার হাতে তুলে দিয়েছেন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে জীবনের শেষ দিনগুলোতে সে অনুভব করেছিল একটুখানি মানুষের মতো বাঁচার মর্যাদা ও অধিকার। মৃত্যুর পূর্বে শিশুটির আধো-আধো কণ্ঠে সবার জন্য করা দোয়া উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে তোলে।
গত ২৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দীর্ঘ ৪২ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে চিরতরে না ফেরার দেশে পাড়ি জমায় ইউসুফ। শিশুটির অকাল ও বেদনাদায়ক এই বিদায়ের খবরটি যখন মানবিক শওকতের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ এবং ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত হয়, তখন তা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। সমাজের নানা প্রান্তের হাজার হাজার মানুষ এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একটি শিশুর জীবন এত কষ্টের মধ্য দিয়ে শেষ হলো, অথচ পৃথিবীর নিষ্ঠুর বাস্তবতায় সে নিজের বলে কাউকে পেল না।
ইউসুফের এই চলে যাওয়া কেবল একজন এতিম শিশুর মৃত্যু নয়; এটি সমাজের মানবিক বিবেককে নাড়া দিয়ে যাওয়া এক গভীর ক্ষত, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় অবহেলিত ও ছিন্নমূল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ কতটা জরুরি।
Leave a Reply