
দক্ষিণের অপরাধ সংবাদ ::
গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। এই পরিচয় কেবল একটি উপাধি নয়; এটি একটি বিশাল দায়িত্বের প্রতীক। কারণ একটি সংবাদ যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সমাজকে জাগ্রত করতে পারে, তেমনি একটি অসতর্ক, একপাক্ষিক বা যাচাইবিহীন সংবাদ একজন নির্দোষ মানুষের জীবন, সম্মান, পরিবার ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিতে পারে। আবার একইভাবে প্রকৃত অপরাধীকে অযথা নির্দোষ হিসেবে উপস্থাপন করাও ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সাংবাদিকতার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো—সত্যের অনুসন্ধান। সত্য প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে যদি প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার তাড়না, আবেগ, ব্যক্তিগত পক্ষপাত কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপে সংবাদ পরিবেশিত হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যক্তি, সমাজ এবং সর্বোপরি গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে প্রায়ই এমন দৃশ্য দেখা যায়—সকালে একটি গণমাধ্যম কোনো ব্যক্তিকে “ভয়ংকর অপরাধী” হিসেবে উপস্থাপন করছে, অথচ বিকেলে একই প্রতিষ্ঠানের অন্য সংবাদ কিংবা অন্য কোনো গণমাধ্যমে সেই ব্যক্তিকেই “নির্দোষ”, “ষড়যন্ত্রের শিকার” বা “দুধের ধোয়া তুলসী পাতা” হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এমন পরস্পরবিরোধী সংবাদ জনগণকে বিভ্রান্ত করে, বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে।
মনে রাখতে হবে, অভিযোগ উঠলেই কেউ অপরাধী হয়ে যায় না। আবার অভিযোগ হয়েছে বলেই কাউকে নিষ্পাপ বা নির্দোষ বলে প্রচার করারও কোনো সুযোগ নেই। আদালতের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনের দৃষ্টিতে বিচারাধীন; তার অপরাধ বা নির্দোষিতা নির্ধারণের একমাত্র এখতিয়ার আদালতের। গণমাধ্যমের কাজ বিচারকের আসনে বসা নয়; বরং নিরপেক্ষভাবে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং জনস্বার্থে তা প্রকাশ করা।
বিশেষ করে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা কিংবা নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় সাংবাদিকদের দায়িত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। সম্প্রতি বোরহানউদ্দিন উপজেলার হাসননগর ইউনিয়নের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মাধ্যমে শিক্ষককে উল্লেখ করে সংবাদ প্রকাশের বিষয়টি জনমনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। এমন ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে একই সঙ্গে তদন্ত ও বিচার শেষ হওয়ার আগেই কাউকে নিশ্চিত অপরাধী অথবা নিশ্চিত নির্দোষ হিসেবে উপস্থাপন করাও সমানভাবে অনৈতিক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন।
একটি ভুল শিরোনাম, একটি অসম্পূর্ণ সংবাদ কিংবা একটি যাচাইহীন তথ্য একজন মানুষের সারাজীবনের পরিচয় বদলে দিতে পারে। পরবর্তীতে যদি আদালতে প্রমাণিত হয় যে সংবাদে প্রকাশিত তথ্য সঠিক ছিল না, তখন সেই ব্যক্তির হারিয়ে যাওয়া সম্মান, সামাজিক মর্যাদা, কর্মজীবন কিংবা সন্তানের ভবিষ্যৎ কি আর ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব? আবার অন্যদিকে, যদি প্রকৃত অপরাধীকে তদন্তের আগেই নির্দোষ বলে প্রচার করা হয়, তবে ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচারের পথও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সাংবাদিকতা কোনো পক্ষের হয়ে কথা বলার পেশা নয়; এটি সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর দায়িত্ব। তাই গণমাধ্যমের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি শিরোনাম এবং প্রতিটি ছবি প্রকাশের আগে সাংবাদিকদের নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখা উচিত—”এই সংবাদ কি সত্য, যাচাইকৃত, নিরপেক্ষ এবং জনস্বার্থে প্রকাশযোগ্য?” যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে সেই সংবাদ প্রকাশ না করাই হবে প্রকৃত পেশাগত সততা।
স্বাধীন গণমাধ্যম একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি। কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে সমানভাবে জড়িয়ে আছে জবাবদিহিতা, নৈতিকতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। গণমাধ্যম যেন কখনো আদালতের বিকল্প না হয়, আবার অপরাধের আড়ালও না হয়। তাদের কলম যেন কারও অযাচিত সাজা কিংবা অযাচিত অব্যাহতির কারণ না হয়ে ওঠে।
আমরা এমন সাংবাদিকতা চাই, যেখানে শিরোনামের আগে সত্যের যাচাই হবে; আবেগের আগে প্রমাণের মূল্য থাকবে; প্রতিযোগিতার আগে নৈতিকতা স্থান পাবে। সংবাদ হোক সত্যের আয়না, ন্যায়বিচারের সহযাত্রী এবং জনগণের আস্থার প্রতীক। কারণ একটি দায়িত্বশীল সংবাদ শুধু তথ্যই দেয় না—এটি একটি সভ্য, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
# মোঃ বাহাদুর চৌধুরী
দক্ষিণের অপরাধ সংবাদ।
মানবাধিকার সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব।
০১৩২৩০০২৩৭৭( লেখাটি ভালো লাগলে সবাই শেয়ার করবেন)
Leave a Reply