
বাহাদুর চৌধুরী :
গোপালগঞ্জ জেলার মুসলিম নারী রুচি আর বেঁচে নেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে এখনো রয়ে গেছে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন, যার উত্তর তাঁর গোপালগঞ্জ জেলার পরিবার, স্বজন, মানবাধিকারকর্মী এবং সাধারণ মানুষ জানতে চান।
অভিযোগ ও বিভিন্ন সূত্রে জানা তথ্য অনুযায়ী, রুচি ভালোবেসে ভোলা জেলার দক্ষিণ জয়নগর ইউনিয়নের দাঁতের চিকিৎসক শরীফকে বিয়ে করেছিলেন। দাম্পত্য জীবনের শুরুটা স্বাভাবিক থাকলেও পরবর্তীতে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েকে কেন্দ্র করে তাঁদের সংসারে নানা জটিলতা তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
রুচিকে যারা কাছ থেকে চিনতেন, তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী তিনি ছিলেন শান্ত, ভদ্র, ধার্মিক ও ভালো মনের একজন নারী। তাহলে কী এমন ঘটেছিল যে জীবনের শেষ সময়গুলো তাঁকে এত কষ্ট ও দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে কাটাতে হলো?
রুচিকে তাঁর স্বামী শরীফ, কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী এবং স্বামীর বোনের ছেলের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে—এমন গুরুতর অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব অভিযোগ সত্য কি না, তা অবশ্যই নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
আরও একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো—রুচি যে ঘরে থাকতেন, সেই ঘরের টিনে একটি ফুটো পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই ফুটো দিয়ে তাঁকে মাঝে মাঝে খাবার দেওয়া হতো। যদি অভিযোগটি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে এটি অত্যন্ত গুরুতর ও অমানবিক আচরণের ইঙ্গিত বহন করে। তাই ঘরটির টিনের ফুটোসহ সংশ্লিষ্ট সব আলামত সংরক্ষণ ও ফরেনসিকভাবে পরীক্ষা করা জরুরি।
এছাড়াও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া অত্যন্ত জরুরি—
১. রুচি মৃত্যুর মাত্র প্রায় এক সপ্তাহ আগে কেন তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে গণমাধ্যম ও মানবাধিকারকর্মীদের কাছে অভিযোগ করেছিলেন?
২. রুচির স্বামী শরীফ কেন তাঁর বিরুদ্ধে দৌলতখান থানায় মামলা করেছিলেন? সেই মামলার প্রকৃতি ও তদন্তের অগ্রগতি কী ছিল?
৩. রুচিকে এর আগে নির্যাতন করা এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করার যে অভিযোগ রয়েছে, সেটি সত্য কি না? সত্য হলে সেই ঘটনার আইনগত ব্যবস্থা কী নেওয়া হয়েছিল?
৪. রুচির মৃত্যুর পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত না করে কেন তড়িঘড়ি করে তাঁর মরদেহ দাফন করা হলো?
৫. রুচির শরীরে স্যালাইনের সুই দেওয়ার চিহ্ন বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা-আলামত থাকলে, সেগুলোর উৎস কী এবং সেগুলো কোথায়? কোনো চিকিৎসা গ্রহণ করা হয়ে থাকলে তার নথিপত্র কোথায়?
৬. মৃত্যুর আগে রুচির শারীরিক অবস্থা কেমন ছিল এবং তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক, দুর্ঘটনাজনিত নাকি অন্য কোনো কারণে হয়েছে—এ বিষয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ কী বলে?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রুচির ভোলা জেলায় আপনজন কেউ নেই—এ কারণে যেন তাঁর ন্যায়বিচারের অধিকার কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়। একজন মানুষের পাশে তাঁর পরিবার না থাকলেও রাষ্ট্রের আইন, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁর পাশে থাকার দায়িত্ব রাখে।
তাই সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন ও তদন্তকারী সংস্থার প্রতি জোরালো আহ্বান—
রুচির মৃত্যুর ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক।
প্রয়োজনে মরদেহের ময়নাতদন্ত/পুনঃময়নাতদন্তের আইনগত সুযোগ ও প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা হোক।
ঘটনাস্থল ও রুচির ব্যবহৃত ঘরটি সুরক্ষিত করে টিনের ফুটোসহ সব সম্ভাব্য আলামত সংগ্রহ ও ফরেনসিক পরীক্ষা করা হোক।
রুচির পূর্বের অভিযোগ, থানায় দায়ের হওয়া মামলা এবং নির্যাতনের অভিযোগগুলো তদন্তের আওতায় আনা হোক।
মৃত্যুর আগে ও পরে রুচির সঙ্গে যোগাযোগকারী ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং প্রাসঙ্গিক মোবাইল/ডিজিটাল তথ্য আইনানুগভাবে যাচাই করা হোক।
কোনো আলামত নষ্ট, গোপন বা অপসারণ করা হয়ে থাকলে তারও তদন্ত করা হোক।
তদন্তে অভিযোগগুলোর কোনোটি সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
রুচি আজ নেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সত্য যেন হারিয়ে না যায়।
আমরা কোনো ব্যক্তিকে আগেভাগে দোষী সাব্যস্ত করতে চাই না। আমরা চাই সত্য উদঘাটিত হোক, নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক।
রুচির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
রুচির জন্য ন্যায়বিচার চাই।
সত্য উদঘাটন চাই।
নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।
✍️ সাংবাদিক বাহাদুর চৌধুরী
যুগ্ম মহাসচিব
ডিজিটাল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন, কেন্দ্রীয় কমিটি
Leave a Reply