
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি :-
মোঃ আশরাফ ইকবাল পিকলু মাজমাদার।
লালনের দর্শনে মানবতা,অসাম্প্রদায়িকতা ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধান।
বাউলসম্রাট ফকির লালন শাহের ভাবদর্শন,মানবতাবাদী চেতনা এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে তাঁর অনন্য অবদান নিয়ে কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ফকির লালন শাহ বাংলার ভাব ও ভাষার ঐশ্বর্য শীর্ষক সেমিনার। আলোচনায় লালনের দর্শনকে শুধু বাউলগান কিংবা লোকজ সংস্কৃতির অংশ হিসেবে নয়,বরং বাঙালির আত্মঅনুসন্ধান, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক গভীর সাংস্কৃতিক ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন কবি,ভাবুক,লেখক ও গবেষকেরা।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় কুষ্টিয়ার লালন একাডেমি চত্বরে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবি, ভাবুক ও নবপ্রাণ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ফরহাদ মজহার। বিশেষ অতিথি ছিলেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন-হাসান,লেখক, গবেষক,সংস্কৃতিসেবী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী বাউল দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল খন্দকার।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, লালনের দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ। জাত-পাত,ধর্মীয় বিভাজন কিংবা সামাজিক পরিচয়ের সংকীর্ণ গণ্ডিকে অতিক্রম করে তিনি মানুষকে মানুষের পরিচয়ে আবিষ্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর গানের প্রতিটি পঙ্ক্তিতে যেমন আত্মজিজ্ঞাসার সুর রয়েছে, তেমনি রয়েছে সমাজের প্রচলিত বিভাজন ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে গভীর মানবিক উচ্চারণ। সময়ের পরিবর্তন হলেও সেই মানবিক দর্শনের আবেদন আজও অমলিন।
আলোচনায় উঠে আসে লালনের ভাষাশৈলীর অনন্য বৈশিষ্ট্যের কথাও। বক্তারা বলেন,লালনের ভাষা ছিল সহজ, স্বাভাবিক ও মাটির কাছাকাছি; অথচ সেই সরল ভাষার ভেতর নিহিত ছিল গভীর দর্শন,আত্মতত্ত্ব ও জীবনবোধ। গ্রামবাংলার মানুষের মুখের ভাষা,উপমা ও প্রতিদিনের জীবন-অভিজ্ঞতাকে তিনি এমন শিল্পিত রূপ দিয়েছেন,যা বাংলা ভাবজগত ও লোকসংস্কৃতিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র প্রকাশভঙ্গি।
লালনকে বুঝতে হলে শুধু তাঁর গান শোনা যথেষ্ট নয় এমন মতও উঠে আসে সেমিনারে। তাঁর সময়কাল,সমাজব্যবস্থা, মানুষের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক বিভাজনের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানকে গভীরভাবে অনুধাবনের ওপর গুরুত্ব দেন লেখক ও গবেষকেরা। তাঁদের মতে,লালনের সৃষ্টিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হলে গবেষণা,মুক্ত আলোচনা ও প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার পরিধি আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।
সেমিনার শেষে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম লালন শাহ একাডেমি চত্বর ও লালন শাহ মাঠ পরিদর্শন করেন। এ সময় লালনের স্মৃতি,তাঁর সাধনভূমি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে অবহিত হন তিনি।
কুষ্টিয়ার মাটিতে লালনকে ঘিরে এমন মননশীল আয়োজনকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যচর্চার গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, লালনের দর্শন যত বেশি মুক্ত ও গভীর আলোচনার বিষয় হবে,ততই তাঁর মানবিক বোধ,অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং বাংলার ভাব ও ভাষার অন্তর্নিহিত ঐশ্বর্য নতুন প্রজন্মের কাছে আরও অর্থবহ হয়ে উঠবে
Leave a Reply