
বাহাদুর চৌধুরী।
ভোলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নিয়ে যেভাবে লেখালেখি হচ্ছে, তাতে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে কিছু প্রশ্ন করতেই হয়। অনিয়মের বিরুদ্ধে কলম ধরা অবশ্যই জরুরি; কিন্তু সেই কলম যদি শুধু একজনকে ঘিরে থাকে, তাহলে অনিয়মের পুরো চিত্রটা কি আদৌ সামনে আসে?
একজন গণমাধ্যমকর্মী যখন কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে তথ্য চাইতে যান, তখন তাঁর প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত—কোন তথ্য চাইবেন, কোন প্রশ্ন করবেন, সেই তথ্যের উৎস কী, নথিপত্র কোথায় এবং অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে—এসব পরিষ্কারভাবে জানা।
শুধু মানুষের মুখে শোনা কথা নিয়ে অফিসে গিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া, অথচ বিষয়টির গভীরে কী আছে তা না জানা—এতে সত্য উদঘাটনের চেয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
কোনো কর্মকর্তার কাছে তথ্য চাইতে হলে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন থাকতে হয়। কোন দলিল, কোন রেজিস্টার, কোন হিসাব, কোন বিধি বা কোন প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে অভিযোগটি করা হচ্ছে—সেটিও জানা দরকার। তা না হলে হুট করে অফিসে গিয়ে আবোল-তাবোল প্রশ্ন করে একজন কর্মকর্তাকে অপ্রস্তুত বা বিব্রত করার চেষ্টা সাংবাদিকতা নয়; বরং নিজের অজ্ঞতাকেই প্রকাশ করে।
আমি নিজেও মাঝেমধ্যে এমন পরিস্থিতির সামনে পড়ি—প্রশ্ন শুনে মনে হয়, যিনি প্রশ্ন করছেন তিনিই হয়তো জানেন না আসলে কী জানতে এসেছেন!
এবার মূল কথায় আসি।
কোনো অফিসে অনিয়ম হলে আগে জানতে হবে—কোন খাতে অনিয়ম হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে, কারা জড়িত এবং কারা এর সুবিধা নিচ্ছে। শুধু “দুর্নীতি হচ্ছে” লিখে একজন কর্মকর্তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিলেই পুরো সত্য প্রকাশ হয় না।
ধরুন, একজন দলিলগ্রহীতা খুশি হয়ে কোনো পিয়নকে ৫০ টাকা দিলেন, দারোয়ান বা ঝাড়ুদারকে ২০ টাকা দিলেন। সেই দৃশ্য গোপন ক্যামেরায় ধারণ করে সংবাদ হলো—“সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দুর্নীতি!”
প্রশ্ন হলো—টাকা যদি সংশ্লিষ্ট কর্মচারী নিয়ে থাকেন, তাহলে ব্যক্তিগতভাবে সেই টাকা নেওয়ার দায় কার?
অবশ্যই অফিসপ্রধান হিসেবে সাব-রেজিস্ট্রারের প্রশাসনিক দায় ও জবাবদিহির বিষয় থাকতে পারে। কিন্তু যে ব্যক্তি টাকা নিয়েছে, তার দায়টাও তো স্পষ্টভাবে বলতে হবে। একজনের দায় অন্যজনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেই কি সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়?
আরও বড় প্রশ্ন—অফিসে যদি সত্যিই বড় ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলো কোন কোন খাতে? কীভাবে হচ্ছে? কারা করছে? কারা সুবিধা নিচ্ছে?
এসব অনুসন্ধান না করে শুধু ছোটখাটো ঘটনাকে সামনে এনে একজন কর্মকর্তাকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে উপস্থাপন করা হলে সাধারণ মানুষের কাছে প্রকৃত চিত্র কীভাবে পৌঁছাবে?
আর যদি কোনো কর্মকর্তা কোনো সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা, দলিল লেখকদের নেতা কিংবা অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রত্যাশামতো কাজ না করেন, আর এরপর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ ও লেখালেখি শুরু হয়—তাহলে সেই বিষয়টিও কি অনুসন্ধানের দাবি রাখে না?
আমি বলছি না যে সাব-রেজিস্ট্রার কোনো ভুলের ঊর্ধ্বে। তিনি অন্যায় করলে তাঁর বিরুদ্ধেও লিখুন, প্রমাণ দিন, তদন্ত হোক, ব্যবস্থা হোক। কিন্তু তিনি যদি কোনো অন্যায় না করে থাকেন, শুধু কারও চাহিদামতো কাজ না করার কারণে তাঁকে হেনস্তা করা হয়, সেটিও কোনোভাবেই ন্যায্য হতে পারে না।
আমি কোনো কর্মকর্তাকে ভালো মানুষ হওয়ার সার্টিফিকেট দিতে আসিনি। আমি শুধু বলতে চাই—দায় যার, দায় তার; আর সত্য যা, সত্য তাই।
একজন দলিল লেখক, কর্মচারী, দালাল, প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা কর্মকর্তা—যার যে ভূমিকা, সেটি তথ্য-প্রমাণসহ সামনে আসুক।
একজনকে বলির পাঁঠা বানিয়ে বাকিদের আড়াল করা অনুসন্ধান নয়।
অনিয়মের বিরুদ্ধে কলম ধরুন—অবশ্যই ধরুন। কিন্তু সেই কলম যেন কারও ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণের অস্ত্র না হয়।
ছোট ঘটনাকে বড় করে একজনকে হেনস্তা নয়; বড় অনিয়মের শিকড় কোথায়, সেটাও খুঁজে বের করুন।
কারণ সাংবাদিকতার শক্তি কাউকে হেয় করার মধ্যে নয়—সত্যকে সামনে আনার মধ্যে।
তাই কথা একটাই—
সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে লিখুন, যদি তাঁর বিরুদ্ধে সত্য ও প্রমাণ থাকে।
কিন্তু একই সঙ্গে যারা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধেও লিখুন।
একজনকে টার্গেট করে নয়—পুরো সত্যটা সামনে আনুন।
কারণ সত্য কারও ব্যক্তিগত চাহিদার কাছে জিম্মি হতে পারে না।
ব্যক্তিগত আক্রমণ কমিয়ে দিন
Leave a Reply