
,বাহাদুর চৌধুরী ::
রাজধানীর মতিঝিল গোলচত্বর থেকে এক মুসাফির হেঁটে পল্টনের দিকে যাচ্ছিলেন। জনতা ব্যাংকের সামনে পৌঁছাতেই এক ভিক্ষুক হাত বাড়িয়ে বললেন, “ভাই, খুব ক্ষুধার্ত। ১০টা টাকা দিলে কিছু খেতে পারি।”
মুসাফির পকেট থেকে ২০ টাকার একটি নোট বের করে ভিক্ষুকের প্লেটে রাখলেন। উদ্দেশ্য ছিল ১০ টাকা ভাঙতি নিয়ে বাকি ১০ টাকা দান করবেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্য! সত্যের চেয়ে ক্যামেরার ক্লিক যে অনেক বেশি দ্রুত।
ঠিক সেই মুহূর্তে এক অতিউৎসাহী ফটোগ্রাফার ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখে দিলেন—
“রাজধানীতে ভিক্ষুকের কাছ থেকেও চাঁদাবাজি! সাধারণ মানুষ নিরাপদ নয়।”
ব্যস! কয়েক মিনিটের মধ্যেই ছবিটি ভাইরাল।
তারপর শুরু হলো লাইভ, টকশো, স্ট্যাটাস, বিশ্লেষণ আর হ্যাশট্যাগের ঝড়। চারদিকে একটাই দাবি—”অপরাধীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে।”
অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন করল, কোথাও বিক্ষোভ মিছিল, কোথাও সড়ক অবরোধ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে রইল সাধারণ মানুষ। রোগীর অ্যাম্বুলেন্স, পরীক্ষার্থীর পথ, কর্মজীবী মানুষের সময়—সবই থমকে গেল। কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটাই—ভাইরাল ছবি।
অবশেষে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সর্বশক্তি নিয়োগ করল। দিন-রাত অভিযান চালিয়ে মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যেই সেই তথাকথিত “ভয়ংকর চাঁদাবাজ” গ্রেপ্তার।
পরদিন সংবাদমাধ্যমের মোটা অক্ষরের শিরোনাম—
“১২ ঘণ্টায় চাঁদাবাজ গ্রেপ্তার—দ্রুত অভিযানে সংশ্লিষ্টদের সাফল্য।”
অভিনন্দনের বন্যা বয়ে গেল। করতালিতে মুখর হলো চারপাশ। যেন দেশের সবচেয়ে বড় সংকটের সমাধান হয়ে গেছে।
কিন্তু কিছু প্রশ্ন থেকে যায়—
যেসব বড় অপরাধ, দুর্নীতি বা অনিয়মের বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও কি একই রকম দ্রুততা দেখা যায়?
সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কি কখনো আলোচনার কেন্দ্রে আসে, নাকি তা কেবল পরিসংখ্যান হয়েই থেকে যায়?
ব্যঙ্গের ভাষায় বলা যায়—কখনও কখনও মনে হয়, সত্যের চেয়ে শিরোনাম দ্রুত ছুটে চলে, আর ঘটনার চেয়ে তার প্রচারণাই বড় হয়ে ওঠে।
হয়তো এ কারণেই আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ অনেক সময় ঘটনাকে ছাপিয়ে যায়, আর ভাইরাল হওয়াই যেন সত্যের সবচেয়ে বড় সাক্ষী।
—এটি একটি ব্যঙ্গাত্মক রচনা। বাস্তব কোনো ঘটনা বা ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ করে নয়; বরং প্রচারণা, জনমত ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার প্রবণতা নিয়ে রচিত।
Leave a Reply