
যশোর জেলা প্রতিনিধি,
যশোরের কেশবপুর উপজেলার বাগদহা গ্রামের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী ফারিয়া ইয়াসমিন তিশা (১৫) এর মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকাবাসীর মাঝে নানা গুঞ্জন চলছে। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, তাদের মেয়েকে ধর্ষণ করার ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করাই মানসিক চাপের কারণেই সে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে এবং আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার বিষয়টি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন এবং প্রকৃত দোষীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও সচেতন মহল।
পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, কেশবপুর উপজেলার মজিদপুর ইউনিয়নের বাগদহা গ্রামের ঠিকাদার আলমগীর হোসেনের ছোট মেয়ে ফারিয়া ইয়াসমিন তিশা (১৫) কেশবপুর পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণিতে লেখাপড়া করে। গত মঙ্গলবার (৩০ জুন) সন্ধ্যায় নিহতের নিজ বাড়ির দ্বিতীয় তলার শয়নকক্ষের সিলিং ফ্যানের সাথে গলায় ওড়না পেচানো ঝুলন্ত অবস্থায় তিশার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। পিতামাতা বাড়িতে না থাকায় তিশার মৃত্যুকে ঘিরে এলাকাবাসীর মাঝে শুরু হয় নানা গুঞ্জন। অনেকেরই প্রশ্ন তিশার সাথে কি এমন ঘটনা ঘটেছে, সে হঠাৎ করে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হলো। এই আত্মহত্যার পিছনের মূল রহস্য কি?
তবে থানা পুলিশ এমন একটি সংবেদনশীল ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন এবং মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেছেন। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত এই ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটনের সম্ভাবনা খুবই কম।
একাধিক সূত্রে জানা যায়, তিশার মা মনোয়ারা বেগম অসুস্থতার কারণে চিকিৎসা করানোর জন্য গত ২৬ জুন সকালে পিতামাতা ঢাকায় গিয়েছিলেন। তাদের মেয়ে তিশাকে তার দাদা শাহাদাৎ হোসেন এর কাছে বাড়িতে রেখে গিয়েছিলেন। গত মঙ্গলবার (৩০ জুন) সন্ধ্যায় দাদা শাহাদাৎ হোসেন বাড়ির দ্বিতীয় তলা ভবনের নীচ তলার মেইন গেটের ভিতর থেকে তালাবদ্ধ দেখে তিশাকে ডাকাডাকি করতে থাকেন। বেশ কিছু সময় ডাকাডাকির পরেও তার কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে একই গ্রামের প্রতিবেশী আল আমিন কে জানালে সে বাড়ির পিছনের একটি নারিকেল গাছ বয়ে উঠে দেখো তিশা ঘরের সিলিং ফ্যানের সাথে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় ঝুলে রয়েছে। ওইসময় তার ডাক-চিৎকারে এলাকাবাসী এগিয়ে এসে বাড়ির মেইন গেটের তালা ভেঙে দ্বিতীয় তলায় গিয়ে দেখে শয়নকক্ষেরও দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করা রয়েছে। পরবর্তীতে এলাকাবাসী দরজার লক ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করে ফ্যানের সাথে ওড়না পেঁচানো ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে থানা পুলিশকে খবর দেয়। খবর পেয়ে থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মৃতদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে। এছাড়াও তিশার ব্যক্তিগত ডায়েরি এবং তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন জব্দ করে। তার ডায়েরিতে প্রেমের কথা লেখা থাকলেও বেশ মানসিক কষ্টের কথা লেখা রয়েছে। অধিকাংশ সময় তার পিতামাতার অমানবিক আচরণ ও মারপিট করার বেশ কিছু ঘটনার কথাও লেখা রয়েছে। তিশার মৃত্যুর খবর পেয়ে ওইদিন গভীর রাতে পিতামাতা ঢাকা থেকে বাড়িতে ফেরার পরে তাদের মেয়ের মরদেহের ময়নাতদন্ত করতে দিতে অস্বীকার করেন এবং বলেন আমাদের কোন অভিযোগ নেই। এছাড়াও পরিবারের সকলেই নিহতের মরদেহের ময়নাতদন্ত না করার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের নিকট অনুরোধ জানানোর পাশাপাশি তারা বলেন নিহতের পিতামাতার কোন অভিযোগ নেই, তাহলে পুলিশ কেন তিশার মৃতদেহের ময়নাতদন্ত পাঠাবে। পিতামাতা বাড়িতে না থাকা এবং স্থানীয়দের নানা গুঞ্জনে মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য পরেরদিন ভোরে নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ থানায় নিয়ে যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেন। ময়নাতদন্ত শেষে ১ জুলাই ৩ ঘটিকার সময় নিহতের জানাজা নামাজ শেষে পারিবারিক কবর স্থানে তাকে দাফন করা হয়। দাফনের পরেরদিন মেয়ের পিতা আলমগীর হোসেন তার নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের এক সাক্ষাৎকারে জানান, একই গ্রামের আব্দুল আহাদ মোড়লের ছেলে আব্দুর রহমান নিশানের বিরুদ্ধে তার মেয়েকে ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ তোলেন। যার কারণে তাদের মেয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল ও আলোচনার ঝড় উঠে। ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ তোলা হলেও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সঠিক কোন তথ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি, তবে নিশান ও তিশার অন্তরঙ্গ সম্পর্কের দু’চারটে ছবি ফেসবুকে বেশ ভাইরাল হয়েছে। নিহতের পরিবারের সকলেই তাদের মেয়ের ময়নাতদন্ত করতে না দিতে চাওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে তিশার মৃত্যুর পর থেকে আব্দুর রহমান নিশান এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আল আমিন বলেন, তিশার দাদা আমাকে জানানোর পরেই তাদের বাড়ির পিছনের নারিকেল গাছ উঠে দ্বিতীয় তলার জানালা দিয়ে দেখি তিশার গলায় ওড়না পেচানো অবস্থায় ফ্যানের সাথে ঝুলে রয়েছে। পরবর্তীতে একই গ্রামের রুকমান গাজী, উজ্জ্বল গাজী, লিখনসহ প্রতিবেশী অনেকেই ঘরের দরজা ভেঙে তার মৃতদেহ উদ্ধার করে।
স্থানীয় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকেই বলেন, নিশানের সাথে তিশার দীর্ঘদিন ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ওদের দুজনের সম্পর্কের কথা জানাজানি হলে তিশার পিতামাতা তাদের মেয়ের উপর অনেকটা চাপ সৃষ্টি করলেও গোপনে ওরা দুজন প্রেমের সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তিশার পিতামাতা ঢাকায় অবস্থানকালে পুনরায় জানতে পারে এখনো পর্যন্ত দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক চলছে। ওইসময় পিতামাতা তিশার ফোনে কল করে তাকে বকাঝকা এবং তার উপরে আরো বেশি চাপ সৃষ্টি করার কারণেই হয়তো তিশা আত্মহত্যা করার মতো এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।
এ বিষয়ে আলমগীর হোসেন আলমের চাচাতো বোন মারুফা খাতুনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঢাকায় আমার বড় ভাই হাদিউজ্জামান এর বাসায় আলম ভাই ও ভাবি অবস্থানকালে তিশার মৃত্যুর দিন দুপুরে আলম ভাই এবং ভাবি তিশাকে ফোন করে বকাবকি করে এবং আলম ভাই বিমানে টিকিট কেটে বাড়িতে আসার জন্য চেষ্টা করে। তবে কি এমন ঘটনা, সেটা আমি জানি না।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ উপপরিদর্শক আব্দুল হক বলেন, মৃত্যুর খবর পেয়েই তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে নিহতের মৃতদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন কালে তার শরীরের কোথাও কোন আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে পিতামাতা বাড়িতে না থাকা এবং এলাকাবাসীর নানা গুঞ্জনে মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়। বিষয়টি খুবই গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে কেশবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ রোকসানা খাতুন বলেন, ৮ম শ্রেণির ছাত্রী ফারিয়া ইয়াসমিন তিশার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য নিহতের মরদেহ যশোর জেনারেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়েছিলো। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসার অপেক্ষা এবং এমন একটি সংবেদনশীল ঘটনার সত্য উদঘাটনের জন্য পুলিশের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
Leave a Reply