
মোঃ রাজিব হাসান রাজু
দৈনিক দক্ষিণের অপরাধ সংবাদ
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রথমবারের মতো জীবনসংকটাপন্ন এক রোগীর জটিল জরুরি অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণের কারণে ফেটে যাওয়া টিউব থেকে পেটের ভেতরে ব্যাপক রক্তক্ষরণে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়েছিলেন ২৪ বছর বয়সী গৃহবধূ রিয়া আক্তার। চিকিৎসকদের দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত প্রাণে বেঁচে যান তিনি। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
রোববার (২৫ অক্টোবর ২০২৬) সকালে পেটে তীব্র ব্যথা নিয়ে চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে আসেন রিয়া আক্তার। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাঁকে স্যালাইনসহ হাসপাতালের ওপরের তলায় পাঠানো হয়। সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। একপর্যায়ে রক্তচাপ পরিমাপ করা যাচ্ছিল না, নাড়ির স্পন্দনও অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। তীব্র পেটব্যথায় তিনি অস্থির হয়ে পড়েন এবং শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় চিকিৎসকদের সন্দেহ হয়, তিনি রাপচার্ড এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি বা জরায়ুর বাইরে স্থাপিত গর্ভের থলি ফেটে যাওয়ার কারণে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হয়েছেন। এটি অত্যন্ত জরুরি একটি চিকিৎসা পরিস্থিতি, যেখানে দ্রুত অস্ত্রোপচার না হলে রোগীর জীবন বিপন্ন হতে পারে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে চিকিৎসক ডা. হাসান মাহমুদ দ্রুত ডা. ইশতিয়াক আহমেদকে অবহিত করেন। পরে গাইনি রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. কুলসুম আক্তার লাবণীকে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে সিনিয়র স্টাফ নার্সরা দ্রুত চিকিৎসা কার্যক্রমে যোগ দেন। রোগীর দুই হাতে বড় আকারের ক্যানুলা স্থাপন করে দ্রুত শিরাপথে তরল দেওয়া শুরু হয়। গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. কুলসুম আক্তার লাবণী রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করে রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করেন।
রোগীর জীবন রক্ষায় দ্রুত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্বজনদের জানানো হয়, রোগীর অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন এবং অস্ত্রোপচার ছাড়া তাঁকে বাঁচানো কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে ভোলা বা বরিশালে স্থানান্তর করতে গেলে পথে বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা ছিল। পরে পরিবারের সদস্যরা অস্ত্রোপচারে সম্মতি দেন এবং জরুরি ভিত্তিতে চার ব্যাগ রক্ত সংগ্রহের উদ্যোগ নেন।
এ সময় অ্যানেসথেসিয়া কনসালট্যান্ট ডা. মনিরুজ্জামান রোগীকে পরীক্ষা করেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। স্বজনরা দ্রুত রক্তের ব্যবস্থা করলে রোগীকে অস্ত্রোপচার কক্ষে নেওয়া হয়।
অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর পেটের ভেতরে বিপুল পরিমাণ জমাট ও তরল রক্ত দেখতে পান চিকিৎসকেরা। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, পেটের ভেতরে প্রায় তিন লিটার রক্তক্ষরণ হয়েছিল। জটিল পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। এতে আপাতত প্রাণে রক্ষা পান রিয়া আক্তার। চিকিৎসা চলাকালে এ পর্যন্ত তাঁর শরীরে ছয় ব্যাগ রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন হয়েছে।
এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি
এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে নিষিক্ত ডিম্বাণু জরায়ুর ভেতরে স্থাপিত না হয়ে সাধারণত ফ্যালোপিয়ান টিউবে বেড়ে উঠতে থাকে। গর্ভের বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে টিউব ফেটে গিয়ে পেটের ভেতরে মারাত্মক রক্তক্ষরণ হতে পারে। সময়মতো রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে এটি মায়ের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, গর্ভধারণের শুরু থেকেই চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো জরুরি। পাশাপাশি নিয়মিত গর্ভকালীন সেবা বা এএনসি (ANC) গ্রহণ করতে হবে। গর্ভাবস্থায় তীব্র পেটব্যথা, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অনুভূতি বা রক্তপাত দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এই জটিল অস্ত্রোপচারের ঘটনা জরুরি চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল। তবে গর্ভাবস্থার শুরুতেই যথাযথ পরীক্ষা ও চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে এ ধরনের জটিলতা দ্রুত শনাক্ত করা এবং জীবনহানির ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
Leave a Reply