
নেত্রকোনায় সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা: ঢাকা প্রেসক্লাব, মানবাধিকার ফাউন্ডেশন ও শ্রমিক পার্টি,দক্ষিণের অপরাধ সংবাদ এ-র তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ
সাংবাদিক হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত, খুনি ও নেপথ্যের মদদদাতাদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি
বাহাদুর চৌধুরী।
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে টেলিভিশন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় গভীর শোক, তীব্র ক্ষোভ, নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ঢাকা প্রেসক্লাবের সভাপতি আরঙ্গজেব কামাল, ডিজিটাল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি আবু জাফর, ভোলা জেলা শ্রমিক পার্টির সভাপতি আলহাজ্ব জামাল উদ্দিনসহ,এবং দৈনিক দক্ষিণের অপরাধ সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক রাজীব আহমেদ রাজু ও বিভিন্ন সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর ২০২৬) রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর পৌরসভার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উতরাইল বাজার এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার জেলা প্রতিনিধি সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে সাংবাদিক সমাজসহ বিভিন্ন মহলে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মোটরসাইকেলে আসা দুই যুবক সাংবাদিক আলিফ ফকিরকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডে একজন সংবাদকর্মীর প্রাণহানির পাশাপাশি দেশের সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ এক বিবৃতিতে বলেন, সাংবাদিকের কলম থামাতে গুলি, সত্য প্রকাশের অপরাধে প্রাণনাশ—কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। একজন সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা করা শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ও আশ্রয় কেড়ে নেওয়া নয়; এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং জনগণের জানার অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত।
তাঁরা বলেন, সাংবাদিকরা সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি, অপরাধ ও অবিচারের চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরেন। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি তাঁদের জীবন দিতে হয়, তাহলে তা রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অবহেলা, গাফিলতি কিংবা দায়সারা পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।
আগের হামলার ঘটনা তদন্তের দাবি
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, স্থানীয় সূত্রের দাবি অনুযায়ী, এর আগেও সাংবাদিক আলিফ ফকিরকে কুপিয়ে জখম করার ঘটনা ঘটেছিল। পূর্ববর্তী হামলার সঙ্গে বর্তমান হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। আগের হামলার বিষয়ে কোনো অভিযোগ দায়ের হয়ে থাকলে, সেটির তদন্ত, আইনগত পদক্ষেপ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখাও জরুরি।
নেতৃবৃন্দ বলেন, আগের হামলার অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করা হয়েছিল কি না এবং সাংবাদিকটির নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট করতে হবে। অতীতের কোনো হামলার অভিযোগ উপেক্ষিত হয়ে থাকলে, তার কারণও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
খুনি, পরিকল্পনাকারী ও নেপথ্যের মদদদাতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে
সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ জোর দিয়ে বলেন, শুধু ঘটনায় সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করলেই চলবে না; হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কোনো পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা কিংবা মদদদাতা রয়েছে কি না, তাও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করতে হবে। তবে তদন্তের আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
তাঁরা আরও বলেন, সাংবাদিক হত্যার পর সাময়িক তৎপরতা দেখিয়ে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংরক্ষণ এবং স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিহত সাংবাদিকের পরিবারের নিরাপত্তা, আর্থিক সহায়তা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় দায়মুক্তির সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। কোনো সাংবাদিক যেন পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলা, হুমকি কিংবা হত্যার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে সরকার, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যমের মালিকপক্ষ এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তাঁরা বলেন, সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে সত্য প্রকাশের অধিকার রক্ষা করা; আর সত্য প্রকাশের অধিকার রক্ষা করা মানে জনগণের অধিকার ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহি সুরক্ষিত রাখা। সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধের যেকোনো অপচেষ্টা আইনের মাধ্যমে প্রতিহত করতে হবে। অপরাধ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে আর কোনো সাংবাদিককে যেন প্রাণ দিতে না হয়, সে জন্য কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
তীব্র প্রতিবাদ, দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি
নেতৃবৃন্দ সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং আইনানুগ বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
তাঁরা আরও বলেন, এ হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। নিহত সাংবাদিকের পরিবার যেন বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের হয়রানি, অবহেলা কিংবা দীর্ঘসূত্রতার শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় থাকতে হবে।
বিবৃতির শেষাংশে নেতৃবৃন্দ নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
তাঁরা প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুততম সময়ের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করবে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাংবাদিক সমাজের উদ্বেগ দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
Leave a Reply