
জিসান রনি
তজুমদ্দিন উপজেলা প্রতিনিধি
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে মেধাতালিকায় স্থান করে নিয়েও শেষ পর্যন্ত পুলিশ ভেরিফিকেশন ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কারণে নিয়োগ থেকে বাদ পড়েছেন দুই হাজারের বেশি প্রার্থী। এতে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন সুপারিশপ্রাপ্ত এসব প্রার্থী ও তাদের পরিবার।
ভুক্তভোগীদের একজন ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার মৌসুমি। প্রায় আট মাস আগে সরকারি প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার খবর পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়েছিলেন তিনি। মেধাতালিকায় তজুমদ্দিন উপজেলায় তার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। চাকরি পাওয়ার পরই বিয়ের আয়োজন করার স্বপ্নও দেখেছিলেন তিনি। তবে নিয়োগপত্রে নিজের নাম না থাকায় সেই আনন্দ এখন পরিণত হয়েছে হতাশায়।
মৌসুমি বলেন, “সেদিন রাতে গেজেট প্রকাশের পর আম্মু আমাকে ফোন করে জানতে চেয়েছিল, গেজেটে আমার নাম এসেছে কি না। আমি বলেছিলাম, নাম আসেনি। যখন দেখলাম গেজেটে আমার নাম নেই, তখন মনে হলো আমার আর বিয়েটা হবে না। হয়তো এই বিয়েটাও করতে পারব না। আমার বয়সও প্রায় শেষের দিকে।”
মৌসুমির মতো মিতু, চম্পা, লোকমানসহ দুই হাজারের বেশি প্রার্থী একই পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। প্রত্যেকের রয়েছে চাকরিকে ঘিরে আলাদা স্বপ্ন ও দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির গল্প।
ভুক্তভোগী কয়েকজন জানান, চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর অনেকেই আগের চাকরি ছেড়ে দিয়ে নতুন স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন। কেউ পরিবারকে নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেছেন, কেউবা বিয়ে ও সংসারের প্রস্তুতি নিয়েছেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিয়োগপত্র না পাওয়ায় সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
তাদের ভাষ্য, “শিক্ষক নিয়োগ আমাদের কোনো আবদার নয়, এটি আমাদের অধিকার। আমরা মেধার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এবং প্রয়োজনীয় সব ধাপ পার করেই এখানে এসেছি। তাই শেষ মুহূর্তে ভেরিফিকেশনের কারণে বাদ দেওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।”
চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে পুলিশ ভেরিফিকেশন ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দুই হাজারের বেশি প্রার্থীকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয় বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।
এ ঘটনায় নিয়োগপত্রের দাবিতে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর শাহবাগে আন্দোলনে নামেন বাদ পড়া প্রার্থীরা। তারা দ্রুত যাচাই-বাছাই শেষ করে যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান।
ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে প্রার্থী বাদ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, “পুলিশ ভেরিফিকেশন শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। তখন এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশবিরোধীদের সরকারি চাকরিতে প্রবেশ ঠেকানো। এখন যদি দুই হাজারের মতো মানুষকে এভাবে বাদ দেওয়া হয়, তাহলে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।”
তীব্র সমালোচনার মুখে রোববার থেকে বাদ পড়া প্রার্থীদের অনেককেই নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১ অক্টোবর পর্যন্ত উত্তীর্ণ প্রার্থীদের পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র দেওয়া হবে।
তবে যেসব প্রার্থী এখনো নিয়োগপত্র পাননি, তাদের মধ্যে উৎকণ্ঠা কাটেনি। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান চান তারা।
Leave a Reply