
বাহাদুর চৌধুরী :
স্কুলে যাওয়ার কথা বলে এক নাবালিকা শিক্ষার্থীকে বাড়ির সামনে থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার পর অন্য জেলায় আটকে রেখে জোরপূর্বক বিয়ে এবং পরবর্তীতে ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবিতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, দাবি করা টাকা না দিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই কিশোরীর সঙ্গে তোলা ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ও তার পরিবার।
ভুক্তভোগী কিশোরীকে প্রতিবেদনে ‘শামীমা’ (ছদ্মনাম) হিসেবে উল্লেখ করা হলো। তার দেওয়া বক্তব্য, পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে অভিযোগগুলোর বিষয়ে আরও অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে।
স্কুলে যাওয়ার কথা বলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
ভুক্তভোগীর বক্তব্য অনুযায়ী, সে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর এলাকার বাসিন্দা এবং লালমোহন উপজেলার একটি স্কুল অ্যান্ড কলেজে দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করত। একই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সূত্রে নূর হাসান নামের এক তরুণের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।
কিশোরীর ভাষ্য, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ সকালে নূর হাসান তার মাকে সঙ্গে নিয়ে তার বাড়ির সামনে আসে। স্কুলে যাওয়ার কথা বলে তাকে একটি সিএনজি অটোরিকশায় উঠিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু তাকে স্কুলে না নিয়ে গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকার একটি গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ তার।
ভুক্তভোগী আরও দাবি করেন, সেখানে তাকে প্রায় দুই দিন আটকে রাখা হয়।
‘২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ সন্ধ্যায় কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে এসে নূর হাসানের সঙ্গে তাকে বিয়ে করার জন্য চাপ দেন। সে নিজের বয়স ১৮ বছর হয়নি জানিয়ে বিয়েতে আপত্তি জানালেও তার আপত্তি উপেক্ষা করে একটি স্ট্যাম্পে ৫ লাখ টাকা কাবিনের কথা উল্লেখ করে বিয়ে সম্পন্ন করা হয় বলে অভিযোগ।
তার দেওয়া জন্মতারিখ ৪ আগস্ট ২০০৯ হলে ওই বিয়ের তারিখে তার বয়স ছিল প্রায় ১৫ বছর ৪ মাস। অর্থাৎ, তার বক্তব্য ও জন্মতারিখের তথ্য সত্য হলে ঘটনাটি একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ের অভিযোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী নারীকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হয় এবং শিশুর সঙ্গে বিয়ে বাল্যবিবাহের আওতায় পড়ে।
বিয়ের কয়েকদিন পর নূর হাসানের পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে গার্মেন্টসে চাকরি করতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন ওই কিশোরী।
তার বক্তব্য, প্রায় এক মাস কাজ করার পর শারীরিক ক্লান্তির কারণে সে আর চাকরি করতে পারবে না জানালে স্বামীর পরিবারের সদস্যরা তার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করেন। একপর্যায়ে তার বাবার বাড়ি থেকে ১০ লাখ টাকা এনে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তিনি তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা এনে দেন বলে দাবি করেছেন।
কিন্তু ওই টাকা দেওয়ার পরও চাপ বন্ধ হয়নি। বরং আরও টাকা দাবি করে তাকে বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ তার।
১০ লাখ টাকা না দিলে তাকে তালাক দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো। একই সঙ্গে বিষয়টি কাউকে জানালে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়।
অবশেষে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন বলে জানান।
তবে সেখানেও শেষ হয়নি অভিযোগের ঘটনা।
ভুক্তভোগীর দাবি, বর্তমানে নূর হাসান ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে আবারও টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। টাকা না দিলে তার সঙ্গে নূর হাসানের ব্যক্তিগত ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে—কোথায় ছিল আইনের সুরক্ষা?
ঘটনার বর্ণনা সত্য হলে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন সামনে আসে। স্কুলে যাওয়ার কথা বলে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীকে অন্য জেলায় নিয়ে যাওয়া, তাকে আটকে রাখা, তার আপত্তি সত্ত্বেও বিয়ের ব্যবস্থা করা এবং পরবর্তীতে অর্থের জন্য চাপ ও নির্যাতনের অভিযোগ—প্রতিটি বিষয়ই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের দাবি রাখে।
বিশেষ করে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে শুধু বর নয়, বিয়ের আয়োজন, সম্পাদন বা এতে সহায়তাকারী ব্যক্তিদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
অন্যদিকে, বিয়েকে কেন্দ্র করে টাকা দাবি বা যৌতুক দেওয়া-নেওয়ার অভিযোগও আইনি প্রশ্নের জন্ম দেয়। বাংলাদেশের যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এ যৌতুক দেওয়া, গ্রহণ করা বা এ উদ্দেশ্যে চুক্তি করার জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে; আইনের অধীনে অপরাধ আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য বলেও বিধান রয়েছে।
তদন্তে যেসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি
ঘটনাটি তদন্ত করতে হলে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন—
১. ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ কিশোরীকে কারা এবং কীভাবে চরফ্যাশন থেকে গাজীপুরের শ্রীপুরে নিয়ে গিয়েছিল?
২. তাকে যে স্থানে দুই দিন রাখা হয়েছিল, সেটি কার বাড়ি বা কার নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল?
৩. ২৬ ডিসেম্বর কথিত বিয়েতে কারা উপস্থিত ছিলেন?
৪. বিয়ের কাগজপত্র বা কাবিননামায় কিশোরীর প্রকৃত বয়স কীভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল?
৫. তার জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নথি এবং বিয়ের নথিতে বয়সের কোনো অসঙ্গতি আছে কি না?
পরিবারের দাবি, ‘আমরা মেয়ের নিরাপত্তা চাই’
ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং মেয়ের নিরাপত্তা চান। তাদের অভিযোগ, মেয়েটিকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়া এবং পরবর্তীতে টাকা আদায়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।
পরিবারের কাছে থাকা জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র, কথিত কাবিননামা, টাকা লেনদেনের প্রমাণ, মোবাইল ফোনের যোগাযোগের তথ্য এবং হুমকির ডিজিটাল প্রমাণ তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হতে পারে।
Leave a Reply