
মোঃ হারুন চৌধুরী,
স্টাফ রিপোর্টার,কুষ্টিয়া :
কুষ্টিয়ার বুক চিরে বয়ে চলা ঐতিহ্যবাহী নদী প্রমত্তা গড়াই। শুধু একটি জলধারা হিসেবে নয়, এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, পরিবেশ ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এই নদী। তবে সময়ের পরিক্রমায় ম্লান হতে বসেছে এর চিরচেনা রূপ। যে গড়াই একসময় হরিপুর এলাকা দিয়ে প্রবল বেগে প্রবহমান ছিল, তা আজ পলি জমে স্বকীয় গতিপথ হারাতে বসেছে। প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম আর মানুষের অবহেলার যৌথ প্রভাবে নদীটি এখন ধীরে ধীরে কুষ্টিয়ার মঙ্গলবাড়ির দিকে মোড় নিচ্ছে, যা স্থানীয় বাসিন্দা ও নদী গবেষকদের চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে গড়াই নদীর গতিপথ পুরোপুরি পরিবর্তিত হয়ে যাবে। এর ফলে তীব্র নদীভাঙনে বিলীন হতে পারে বিস্তীর্ণ জনবসতি ও উর্বর ফসলি জমি। বদলে যেতে পারে কুষ্টিয়ার চেনা ভৌগোলিক মানচিত্র।
নদীবিদদের মতে, গতিপথ পরিবর্তনের প্রধান কারণ এর তলদেশে বিপুল পরিমাণ পলি ও বালু জমা হওয়া। বিশেষ করে হরিপুর অংশে নদীগর্ভে অতিরিক্ত পলি জমায় নদীটি অত্যন্ত অগভীর হয়ে পড়েছে। ফলে পানি তার স্বাভাবিক প্রবাহের পথ না পেয়ে বাধ্য হয়ে মঙ্গলবাড়ির দিকে নতুন পথ তৈরি করছে, যা সৃষ্টি করছে তীব্র ভাঙন ও জনপদের ঝুঁকি। “নদীকে রক্ষা করা না গেলে কুষ্টিয়ার পরিবেশ ও অর্থনীতি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। তবে এখনো সঠিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিলে এই বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব।” এই ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে কুষ্টিয়াকে রক্ষা করার উপায় এখনো হাতের নাগালে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জরুরি ভিত্তিতে কিছু প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন। নদীর তলদেশে জমে থাকা পলি ও বালি আধুনিক ড্রেজিং ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত অপসারণ করে পানির নাব্য ফিরিয়ে আনা।’হ্যাম ভোলে’ বা আধুনিক পাইলিং এবং মজবুত তীর সংরক্ষণ প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে নদীর মূল গতিপথকে পূর্বের অবস্থায় ধরে রাখা । সূর্যাস্তের আলোয় গড়াইয়ের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এ অঞ্চলের মানুষের চোখে আজ দুশ্চিন্তার পাশাপাশি রয়েছে একটাই প্রত্যাশা—নদীর স্বাভাবিক রূপ ফিরে আসুক। গড়াই নদীকে বাঁচানো মানেই মূলত কুষ্টিয়াকে বাঁচানো। আগামী এক দশকের মধ্যে সম্ভাব্য বড় বিপর্যয় এড়াতে এখনই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত ড্রেজিং প্রকল্প। প্রকৃতিকে তার নিজস্ব গতিতে প্রবহমান রাখতে এবং জনপদ রক্ষা করতে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট পানিসম্পদ কর্তৃপক্ষের দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপই পারে প্রমত্তা গড়াইয়ের রূপালী ধারাকে চিরকাল অক্ষুণ্ণ রাখতে।
Leave a Reply