
গ্রাম্য সালিশ এখন বাণিজ্যিক আদালত
✍️ মোঃ আশরাফ ইকবাল পিকলু মাজমাদার
খুলনা বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান।
প্রতিবেদক দৈনিক দক্ষিণের অপরাধ সংবাদ
কুষ্টিয়ার গ্রামীণ জনপদে এখন সালিশ মানেই টাকা-পয়সার খেলা,পক্ষপাতের নাটক আর বিচার বঞ্চনার নিষ্ঠুর বাস্তবতা।
ইউনিয়ন পরিষদ গুলোতে বর্তমানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত কোনো জন প্রতিনিধি নেই।
এই প্রশাসনিক শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির স্বঘোষিত সালিশ ব্যবসায়ী তৈরি করেছে এক অদৃশ্য সালিশ সিন্ডিকেট।
কুষ্টিয়ার খোকসা,কুমারখালী,মিরপুর,ভেড়ামারা,দৌলতপুর এবং সদর উপজেলার ইউনিয়ন গুলোতে জমি সংক্রান্ত সালিশ এখন রীতিমতো আয়বর্ধক বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে।
এইসব এলাকায় বহু সালিশ বসছে থানার গোল ঘরে, কোনো প্রভাবশালীর ব্যক্তিগত বসত বাড়িতে কিংবা ব্যক্তিগত অফিসে।
সালিশে বিচার নয়,চলছে দর কষাকষি—কে কত টাকা দিতে পারবে,তাই-ই রায় নির্ধারণের মাপকাঠি। উভয় পক্ষ থেকে নেওয়া হচ্ছে সালামি।
একজন অভিজ্ঞ সালিশকারীর স্বীকারোক্তি এমন ছিল:
কি করুম ভাই। ছোট মেয়ায় দিছিলো,কিন্তু বড় মেয়ে বেশি দিছে। তাই বড় মেয়ার পক্ষেই বেশিতে টেনে নিয়ে গিয়েছে।
এই উক্তি হাস্যকর হলেও এটি গ্রামীণ বিচার ব্যবস্থার নৈতিক ও মূল্যবোধ গত পতনের এক নির্মম চিত্র। ভুক্ত ভোগীদের মতে,সালিশের নামে ৫০০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়।
টাকা না দিলে হয়রানি, সময়ক্ষেপণ,কিংবা একতরফা রায়—এই তিনটি পথের একটিতেই ঠেলতে হয় বিচার প্রার্থীদের।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—এই দুর্নীতির নেপথ্যে রয়েছে প্রশাসনের নীরবতা এবং কিছু অসাধু প্রভাবশালী মহলের মদদ।
ফলে এই সালিশ সিন্ডিকেট এখন শুধু চাঁদাবাজি ও পক্ষপাত নয়,বরং জমি দখল, হুমকি-ধামকি ও রাজনৈতিক দাপট দেখিয়ে পুরো বিচার ব্যবস্থাকেই জিম্মি করে ফেলেছে।
এমনত অবস্থায় সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
গ্রাম্য সালিশ তো ছিল দরিদ্র মানুষের ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়স্থল।
সেটাও যদি টাকার খেলায় রূপ নেয়,তাহলে বিচার ব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা আর অবশিষ্ট থাকবে না।
এই ভয়ঙ্কর অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হলে চাই:
ইউনিয়ন পরিষদ গুলোতে প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে স্বচ্ছ সালিশি কার্যক্রম
প্রতি সালিশে সরকারি পর্যবেক্ষণ বাধ্যতামূলক করা
স্বঘোষিত সালিশকারীদের তালিকা করে আইনানুগ ব্যবস্থা
জেলা প্রশাসনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে গ্রামীণ বিরোধ নিষ্পত্তির কাঠামো
#এমন ভয়ঙ্কর বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা যদি এখনই কথা না বলি,তাহলে কাল হয়তো আর কেউ ন্যায়ের কথা বলার সাহসই করবে না।
আজ সময় এসেছে একজোট হয়ে প্রশ্ন তোলার—এই দেশ কি দুর্নীতিবাজ সালিশ কারবারিদের হাতে জিম্মি হয়ে থাকবে,না কি সত্যিকারের ন্যায়বিচারের সমাজ গড়ার পথে আমরা হাঁটব?
Leave a Reply