
সাহেদা বেগম, মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে নারী সাংবাদিকদের পথ এমনিতেই সহজ নয়। মাঠে কাজ করতে গিয়ে নানা বাধা, নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক চাপ মোকাবিলা করেই তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হয়। তার ওপর যদি সহকর্মী পুরুষ সাংবাদিকদের কাছ থেকেই বৈষম্য, কটূক্তি, অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিগত মন্তব্য কিংবা হয়রানির শিকার হতে হয়—তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, এই বৈষম্যের শেষ কোথায়?
কিছু নারী সাংবাদিকের অভিযোগ—কিছু পুরুষ সহকর্মী পেশাগত সম্পর্কের আড়ালে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা বা ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তার চেষ্টা করেন। কোনো নারী তাতে সাড়া না দিলে কিংবা নিজের সীমারেখা স্পষ্ট করে দিলে তাঁর প্রতি আচরণ বদলে যায়; শুরু হয় অবহেলা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য কিংবা পেশাগতভাবে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা।
কোনো নারী সাংবাদিক কারও সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ঠ হবেন কি না, কারও কথায় সাড়া দেবেন কি না—এটি সম্পূর্ণ তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান করতে না পারা এবং তার প্রতিক্রিয়ায় পেশাগত বৈষম্য সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আর একটি কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার—
নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে সম্মানজনকভাবে কথা বলতে না পারা কোনো পুরুষের দুর্বলতা হতে পারে, কিন্তু সেই কারণে নারী সাংবাদিককে অপমান, অবহেলা বা বৈষম্যের শিকার করার অধিকার কারও নেই।
নারী সাংবাদিক কারও বিনোদনের বস্তু নন।
কারও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা পূরণের মাধ্যম নন।
কারও মন জয় করার জন্য সাংবাদিকতায় আসেননি।
তাঁরা এসেছেন নিজের যোগ্যতা, শ্রম ও সাহস দিয়ে সাংবাদিকতা করতে।
যেসব পুরুষ সাংবাদিক নারী সহকর্মীর যোগ্যতার বদলে তাঁর নারী পরিচয় নিয়ে বিচার করেন, ব্যক্তিগত সম্পর্ককে পেশাগত মূল্যায়নের সঙ্গে মেশান কিংবা সীমারেখা মানতে চান না—তাঁদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি।
চুপ থাকাকে সম্মতি ভাববেন না।
প্রত্যাখ্যানকে অপমান ভাববেন না।
পেশাগত দূরত্বকে ব্যক্তিগত শত্রুতা বানাবেন না।
নারী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, হয়রানি ও অপমানের সংস্কৃতি চলতে পারে না। কোনো অভিযোগ উঠলে সেটিকে ধামাচাপা না দিয়ে যথাযথভাবে তদন্ত ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা এমন সাংবাদিকতা চাই না, যেখানে একজন নারীকে আগে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি কারও ব্যক্তিগত পছন্দের মানুষ নন—তারপর তিনি সাংবাদিক হিসেবে সম্মান পাবেন।
নারী সাংবাদিকের পরিচয়—তিনি একজন সাংবাদিক।
তাঁর সম্মান—তাঁর অধিকার।
তাঁর নিরাপত্তা—তাঁর অধিকার।
তাঁর পেশাগত মর্যাদা—তাঁর অধিকার।
তাই উক্ত পুরুষ সহকর্মীদের প্রতি সরাসরি কথা:
নারী সহকর্মীকে সম্মান করতে শিখুন। তাঁর ‘না’কে ‘না’ হিসেবেই গ্রহণ করুন। আর পেশাগত সম্পর্ককে কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থের হাতিয়ার বানাবেন না।
সাংবাদিকতার ময়দানে লিঙ্গের ভিত্তিতে নয়—যোগ্যতা, সততা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে মানুষকে মূল্যায়ন করুন।
নারী সাংবাদিকদের কণ্ঠ রোধ নয়—তাঁদের নিরাপদে কথা বলার পরিবেশ নিশ্চিত করুন।
Leave a Reply