
আলহাজ্ব জামাল উদ্দিন
হামলা-মামলা, চাপ ও অভ্যন্তরীণ বিভাজনের অভিযোগStaশায় টিকে থাকাই কঠিন হয়ে উঠছে তরুণ সংবাদকর্মীদের
দেশে সাংবাদিকতার পরিসর যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই কঠিন হয়ে উঠছে সংবাদকর্মীদের নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ। বিশেষ করে নবীন ও মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের অনেকেই হামলা, হুমকি, মামলা, সামাজিক চাপ এবং পেশাগত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে মানবাধিকার সংগঠন HRSS-এর তথ্য অনুযায়ী, ২৩৪ জন সাংবাদিক আহত, ৬০ জন হামলার শিকার, ৪৯ জন হুমকির মুখে এবং ১১ জন আটক হয়েছেন। একই সময়ে ৩৩ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার আইনের ১৫টি মামলা হওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে—নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকরা কি স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতায় প্রবেশ ও টিকে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন?
সাংবাদিকতার মাঠে নতুনদের একটি অংশের অভিযোগ, রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপের পাশাপাশি কখনো কখনো গণমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতাও তাদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অভিজ্ঞতা ও পরিচিতির ঘাটতির কারণে নবীন সাংবাদিকরা অনেক সময় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না। কোনো ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাদের বিরুদ্ধে মামলা বা নানা ধরনের চাপ এলে প্রতিষ্ঠানগত সহায়তাও সবসময় নিশ্চিত হয় না।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া প্রতিটি মামলাকে একইভাবে দেখা যায় না। কোনো মামলায় প্রকৃত অপরাধের অভিযোগ থাকতে পারে, আবার কোনো ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার কারণে হয়রানি বা চাপ প্রয়োগের অভিযোগও উঠতে পারে। ফলে প্রতিটি মামলার স্বাধীন, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক সংগঠন Committee to Protect Journalists (CPJ) ২০২৬ সালে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার নিয়ে একাধিকবার উদ্বেগ জানিয়েছে। সংগঠনটি জুনে দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ছয় সাংবাদিকের বিরুদ্ধে করা মামলার প্রসঙ্গও তুলে ধরে।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। Reporters Without Borders-এর ২০২৬ সালের সূচকে বাংলাদেশ ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫২তম অবস্থানে রয়েছে; প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি চাপ, হামলা ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি এখনো বড় সমস্যা।
প্রশ্ন উঠছে গণমাধ্যমের ভেতরেও
বাইরের চাপের পাশাপাশি সাংবাদিকতা পেশার ভেতরের পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রবীণ ও নবীন সাংবাদিকদের মধ্যে পেশাগত দূরত্ব, সুযোগের অসমতা এবং প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।
তবে কোনো ব্যক্তি বা সাংবাদিককে প্রমাণ ছাড়া স্বার্থসন্ধানী, দুর্নীতিগ্রস্ত কিংবা হামলা-মামলার সঙ্গে জড়িত হিসেবে চিহ্নিত করা সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া, নথিপত্র যাচাই করা এবং স্বাধীন অনুসন্ধানের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করাই হওয়া উচিত গণমাধ্যমের দায়িত্ব।
কারণ একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অন্যায় হলে শুধু একজন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হন না—ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষের তথ্য জানার অধিকার।
নবীনদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবি
তরুণ সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, আইনি সহায়তা, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদেরও তথ্য যাচাই, নৈতিকতা, স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য প্রকাশের ক্ষেত্রে পেশাগত মান বজায় রাখতে হবে।
২০২৬ সালের বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্সেও বিশেষজ্ঞরা রাজনৈতিক মেরুকরণ, ভুল তথ্য, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই আলোচনায় স্বাধীন সম্পাদকীয় নীতি ও টেকসই গণমাধ্যম ব্যবসার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে।
সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়; এটি জনগণের জানার অধিকার রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তাই প্রবীণ হোক কিংবা নবীন—কেউই যেন পরিচয়, রাজনৈতিক মত, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে অন্যায় চাপের শিকার না হন।
হামলা হলে তদন্ত চাই, মামলা হলে ন্যায়বিচার চাই, অভিযোগ হলে প্রমাণ চাই।
নবীন সাংবাদিকদের কণ্ঠ যদি শুরুতেই ভয় ও মামলার চাপে স্তব্ধ হয়ে যায়, তাহলে আগামী দিনের গণমাধ্যমে স্বাধীন, অনুসন্ধানী ও সাহসী সাংবাদিকতার জায়গা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। এখন প্রয়োজন—সাংবাদিকের পরিচয় নয়, তার কাজের সত্যতা ও পেশাগত নৈতিকতাকে মূল্যায়ন করা।
Leave a Reply