
মোঃ আশরাফ ইকবাল পিকলু মাজমাদার
খুলনা বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান।
ভোরের আলো ফোটার আগেই যে মানুষটি কাঁধে কোদাল নিয়ে ঘর ছেড়ে মাঠে নামেন,তার নাম কৃষক। হিমেল শীত, প্রখর রোদ কিংবা ঝরঝরে বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে যিনি মাটির সঙ্গে যুদ্ধ করে ফলান সোনার ফসল। সেই ফসলের ভাত খেয়েই আমরা বেঁচে থাকি,শক্তি পাই,জীবন এগিয়ে নিই। অথচ সেই কৃষকের নিজের জীবন আজ সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মুখে।
কুষ্টিয়ার মাঠজুড়ে এখন আলু,কচু,বেগুন,পুঁইশাক,লাল শাক,বাঁধাকপি,ফুলকপি,পেঁয়াজ,রসুন,মরিচ,হলুদ,আদা—বিভিন্ন ধরনের সবজির সবুজ সমারোহ। কিন্তু এই সবুজের আড়ালেই লুকিয়ে আছে কৃষকের দীর্ঘশ্বাস।
সরেজমিনে বিভিন্ন গ্রামের মাঠে ঘুরে কথা বলে জানা গেছে,বর্তমানে কৃষকদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম সার ও কীটনাশক। একদিকে লাগামহীন দাম,অন্যদিকে ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্যের ছড়াছড়ি—সব মিলিয়ে কৃষকের জীবন যেন নাভিশ্বাসে পরিণত হয়েছে।
কুষ্টিয়ার এক প্রান্তিক কৃষক আব্দুল করিম (৫৫) আক্ষেপ করে বলেন,আগে এক বস্তা সারে যেমন ফলন হতো,এখন দুই বস্তাতেও হয় না। দোকানদার ভালো বলেই দেয়,কিন্তু জমিতে দিয়ে দেখি কাজই করে না।
অনেক কৃষক অভিযোগ করেন,বাজারে পাওয়া বহু সার ও কীটনাশক কার্যকর নয়। মোড়কের গায়ে লেখা মান আর ভেতরের উপাদানের মধ্যে নেই কোনো মিল। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে,অথচ কাঙ্ক্ষিত ফলন না পেয়ে লোকসানের বোঝা বইতে হচ্ছে।
মিরপুর উপজেলার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন,পোকা দমনের জন্য তিনবার স্প্রে করেছি, তবুও ফসল রক্ষা করতে পারিনি। পরে জানতে পারি, ওষুধটাই নকল।
শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়,কীটনাশকের নির্বিচার ব্যবহারে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও পড়ছেন কৃষকরা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো ধরনের সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই তারা বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করছেন। এর ফল হিসেবে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট,চোখ জ্বালা ও মাথা ঘোরা এখন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।
এক কৃষক কণ্ঠ ভারী করে বলেন,ফসল বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবনটাই যেন হারিয়ে ফেলছি।
সচেতন মহলের মতে,কৃষি বিভাগের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং বাজার তদারকির দুর্বলতার কারণেই এই সংকট দিন দিন গভীর হচ্ছে। কৃষকদের দাবি—
সার ও কীটনাশকের কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ
ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
সহজ শর্তে ও সময়মতো সরকারি সার সরবরাহ
মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি ও পরামর্শ
কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ,বাঁচবে খাদ্য নিরাপত্তা। যে মানুষের ঘামে ভিজে আমাদের প্রতিদিনের আহার,তার কষ্ট যদি আমরা না শুনি,না বুঝি—তবে উন্নয়নের সব গল্পই থেকে যাবে কাগজে-কলমে।
আজ সময় এসেছে কৃষকের কথা শোনার,তার পাশে দাঁড়ানোর।কারণ কৃষকের চোখের জলেই ভিজে ওঠে আমাদের আগামী।
Leave a Reply