
হাসান হৃদয়, দৈনিক দক্ষিণের অপরাধ সংবাদ
ঘন কুয়াশার কারণে মেঘনা নদীতে দুই যাত্রীবাহী লঞ্চের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ভোলার লালমোহন উপজেলার তিনজনের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। স্বজন হারানোর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) গভীর রাতে। চরফ্যাশনের ঘোষেরহাট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা এমভি জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চের সঙ্গে রাত আনুমানিক ২টার দিকে মেঘনা নদীর চাঁদপুর জেলার হাইমচর ও হরিণা এলাকার মাঝামাঝি স্থানে বরিশাল রুটের এমভি অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চের সংঘর্ষ হয়। দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই একজনসহ মোট চারজনের মৃত্যু হয় এবং অন্তত ১৫ জন যাত্রী আহত হন।
নৌ-পুলিশ চাঁদপুর অঞ্চলের পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ঘন কুয়াশার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চটি জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চের মাঝ বরাবর উঠে গিয়ে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চের দ্বিতীয় তলা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নিহত চারজনের মধ্যে তিনজন ভোলার লালমোহন উপজেলার বাসিন্দা। তারা হলেন—বদরপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাদিরাবাদ এলাকার সেরাজল বেপারীর ছেলে রাজমিস্ত্রি আব্দুল গনি, একই এলাকার গোলাপ খা বাড়ির কালু খার ছেলে মো. সাজু এবং পশ্চিম চরউমেদ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড লালমিয়া গাজী বাড়ির মো. হোসেনের মেয়ে সাথী।
অন্যদিকে পশ্চিম চরউমেদ ইউনিয়নের কচুয়াখালী গ্রামের লালমিয়া গাজী বাড়িতেও চলছে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। গার্মেন্টস কর্মী রিনা বেগমের একমাত্র কন্যা সাথী স্থানীয় একটি মহিলা মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। মায়ের মৃত্যুর খবর শুনে সে বারবার মূর্ছা যাচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে বাবা-মা একসঙ্গে মেয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কচুয়াখালী ঘাট থেকে লঞ্চে ওঠেন। যাওয়ার সময় রোজার ঈদে ফিরে আসার আশ্বাস দিলেও সেই রাতেই আসে মর্মান্তিক খবর। দুর্ঘটনায় সাথীর বাবা মো. হোসেন গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রীদের বরাতে জানা গেছে, সংঘর্ষের সময় লঞ্চের পাশে ঘুমিয়ে থাকা অনেক যাত্রী নদীতে পড়ে যান। কয়েকজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। নিহত এক নারী যাত্রী সংঘর্ষের মুহূর্তে মর্মান্তিকভাবে দ্বিখণ্ডিত হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। অন্য তিনজন গুরুতর আহত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চটি মাঝনদীতে ডুবো-ডুবো অবস্থায় ভাসতে থাকলে ভোলা থেকে ঢাকাগামী এমভি কর্ণফুলী-৯ লঞ্চ দ্রুত এগিয়ে এসে বহু যাত্রীকে উদ্ধার করে ঢাকার উদ্দেশ্যে নিয়ে যায়। স্থানীয় জেলে ও নৌযান শ্রমিকদের সহায়তায় আহতদের উদ্ধার করে নিকটবর্তী হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো হয়।
লালমোহন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. অলিউল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনাটি আমাদের এলাকায় না ঘটলেও নিহত ও আহতদের পরিবার সহায়তা চাইলে আইনগত ও মানবিক সহায়তা প্রদান করা হবে। লাশ এলাকায় পৌঁছালে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহে পুলিশ দায়িত্ব পালন করবে।
এদিকে দুর্ঘটনার সঠিক কারণ নির্ধারণে নৌ-পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
Leave a Reply