
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি :-
মোঃ আশরাফ ইকবাল পিকলু মাজমাদার।
শৈলকুপায় ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলায় মাতল শত শত দর্শক
ঢোলের তালে তালে লাঠির ঝনঝন শব্দ। মুহূর্তেই এক লাঠিয়ালের আঘাত ঠেকিয়ে আরেকজনের ক্ষিপ্র পাল্টা কৌশল। কখনো লাঠির ঘূর্ণি,কখনো শরীরের দুর্দান্ত ভারসাম্য—চোখের সামনে যেন জীবন্ত হয়ে উঠল হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার সেই চিরচেনা ছবি। আধুনিক বিনোদনের দাপটে যখন লোকজ খেলাধুলা ক্রমেই স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিচ্ছে,তখন ঝিনাইদহের শৈলকুপায় ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলার আয়োজন ফিরিয়ে আনল সেই পুরোনো দিনের উচ্ছ্বাস।
শনিবার (৩ অক্টোবর) উপজেলার ১ নম্বর ত্রিবেণী ইউনিয়নের পদমদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় জমজমাট এ লাঠিখেলা। বিকেল গড়াতেই খেলার মাঠ ঘিরে জড়ো হতে থাকেন মানুষ। একসময় মাঠের চারপাশে তৈরি হয় দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড়। দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকেও শত শত মানুষ ছুটে আসেন ঐতিহ্যের এ খেলাটি দেখতে।
খেলা শুরু হতেই বদলে যায় মাঠের পরিবেশ। লাঠিয়ালদের হাতে বাঁশের লাঠি যেন হয়ে ওঠে ছন্দের ভাষা। দ্রুত পদক্ষেপ,নিখুঁত কৌশল আর মুহূর্তের মধ্যে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে দর্শকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। কোনো কোনো কসরতে বিস্ময় প্রকাশ করে হাততালিতে ফেটে পড়েন দর্শকরা। শিশু-কিশোরদের চোখে ছিল কৌতূহল, প্রবীণদের চোখে যেন ফিরে আসে শৈশবের স্মৃতি।
স্থানীয়দের ভাষ্য,একসময় গ্রামবাংলার বিভিন্ন উৎসব, মেলা কিংবা বিশেষ আয়োজনে লাঠিখেলা ছিল অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে বিনোদনের ধরন। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের ব্যস্ততায় হারিয়ে যাচ্ছে মাঠের সেই লোকজ খেলাধুলা। ফলে এমন আয়োজন কেবল বিনোদনের উপলক্ষ নয়,বরং স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলাকে মানুষের সামনে নতুন করে তুলে ধরতেই এ আয়োজন। তরুণ প্রজন্ম যাতে নিজেদের শেকড় ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারে,সেই লক্ষ্যও রয়েছে এ আয়োজনের পেছনে।
ত্রিবেণী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লাভলু মণ্ডলের সার্বিক সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয় এ লাঠিখেলা। আয়োজনে স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি ও সহযোগিতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
দর্শনার্থী সাইদুল ইসলাম বলেন,এ ধরনের খেলা এখন খুব একটা দেখা যায় না। ছোটবেলায় বড়দের সঙ্গে লাঠিখেলা দেখেছি। আজকের আয়োজন দেখে পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল।
আরেক দর্শনার্থী বলেন,শুধু বিনোদন নয়,আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যও এখানে তুলে ধরা হয়েছে। নিয়মিত এমন আয়োজন হলে নতুন প্রজন্ম লাঠিখেলার মতো দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
আয়োজন ঘিরে পদমদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পরিণত হয় এক মিলনমেলায়। মাঠের চারপাশে দর্শকদের ভিড়,শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাস আর লাঠির ছন্দময় শব্দে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
একসময় যে লাঠিখেলা ছিল গ্রামীণ জনপদের বিনোদনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ,সময়ের স্রোতে তা আজ অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। শৈলকুপার এই আয়োজন তাই শুধু একটি দিনের খেলা নয়—এ যেন হারিয়ে যেতে বসা লোকজ ঐতিহ্যের বুকের ওপর আবারও প্রাণের স্পন্দন। লাঠির প্রতিটি ঘূর্ণনে যেন উচ্চারিত হলো একটাই বার্তা—আধুনিকতার ভিড়েও শেকড়ের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
Leave a Reply