
মোঃ আশরাফ ইকবাল পিকলু মাজমাদার
খুলনা বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান।
প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এর অপব্যবহারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নারী ও কন্যাশিশুরা। এই বাস্তবতায় প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতা (টেকনোলজি ফ্যাসিলিটেটেড জেন্ডার বেইসড ভায়োলেন্স—টিএফজিবিভি) প্রতিরোধ ও প্রশমনে গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও জোরদার করার লক্ষ্যে কুষ্টিয়ায় দিনব্যাপী এক দক্ষতা উন্নয়ন কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রোববার (২১ ডিসেম্বর) কুষ্টিয়া শহরের সেতু অফিস প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এ কর্মশালার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সেতু। এতে জেলার প্রিন্ট,ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার ৩০ জন গণমাধ্যম পেশাজীবী অংশগ্রহণ করেন।
কর্মশালায় প্রযুক্তি-সহায়ক জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতার ধরন, প্রভাব,প্রতিরোধ ও প্রশমন কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কীভাবে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়—সে বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক ধারণা দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন,জাতীয় দৈনিক,টেলিভিশন, স্থানীয় পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের মাধ্যমে সংবেদনশীল ও তথ্যনির্ভর প্রতিবেদন টিএফজিবিভি মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
কর্মশালার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন সেতু-এর নির্বাহী পরিচালক ড. মোহাম্মদ আব্দুল কাদের। তিনি বলেন, “ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য। স্থানীয় বাস্তবতা ও করণীয় তুলে ধরে সাংবাদিকদের সক্রিয় ভূমিকা টিএফজিবিভি প্রতিরোধে বড় অবদান রাখতে পারে।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন সেতুর নির্বাহী পরিচালক আব্দুল কাদের। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ফেরদৌস নাজনীন, উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. সাঈদ হাসান এবং সেতুর আইসিটি অফিসার হারুন অর রশিদ। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে কর্মশালাটি কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে।
ডিসেম্বর ২০২৪-এ জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বক্তারা জানান,বিশ্বব্যাপী প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে দুইজন প্রযুক্তি-সহায়ক সহিংসতার শিকার হন। বাংলাদেশে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক—প্রায় ৮৯ শতাংশ নারী ও কন্যাশিশু কোনো না কোনোভাবে এ সহিংসতার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। গবেষণায় দেখা যায়, ৯–১৪ বছর বয়সেই অনেকের প্রথম সাইবার অপরাধের অভিজ্ঞতা ঘটে এবং ১৮–৩০ বছর বয়সী নারীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। অথচ ভুক্তভোগীদের প্রায় ৭৫ শতাংশ কোনো আইনি সহায়তা নেন না কিংবা পরিবারকেও বিষয়টি জানান না।
পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (পিসিএসডব্লিউ)-এর তথ্য অনুযায়ী,২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটি চালু হওয়ার পর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬০ হাজার ৮০৮ জন নারী সাইবার অপরাধের প্রতিকার চেয়েছেন। এর মধ্যে ৪১ শতাংশ ডক্সিং,১৮ শতাংশ ফেসবুক আইডি হ্যাক,১৭ শতাংশ ব্ল্যাকমেইলিং,৯ শতাংশ ইমপারসোনেশন এবং ৮ শতাংশ সাইবার বুলিংয়ের শিকার।
বক্তারা সাইবারস্টকিং,ডক্সিং,হ্যাকিং,অনলাইন হয়রানি, ডিপফেইকসহ চিত্রভিত্তিক নির্যাতন,প্রযুক্তি-সহায়ক যৌন হয়রানি ও বিদ্বেষমূলক ভাষার ব্যবহারকে টিএফজিবিভি-এর ভয়াবহ রূপ হিসেবে তুলে ধরেন। এসব সহিংসতার ফলে নারীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হন, সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শিক্ষা ও কর্মজীবনে স্বাভাবিক অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়।
কর্মশালায় আরও বলা হয়,প্রযুক্তি-সহায়ক সহিংসতা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এটি অনলাইন পরিসরে নারীর অংশগ্রহণ কমিয়ে দিয়ে সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়াকেও শ্লথ করে। তাই টিএফজিবিভি মোকাবিলায় জাতীয় আইন ও নীতিমালায় বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা, আইন প্রয়োগে সক্ষমতা বৃদ্ধি,ডিজিটাল সাক্ষরতা জোরদার এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকরা বলেন,এ ধরনের প্রশিক্ষণ তাদের আরও সংবেদনশীল,অনুসন্ধানী ও তথ্যনির্ভর প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করবে—যা সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
কর্মশালাটি বিএনএনআরসির স্ট্রেংথেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি ফ্যাসিলিটেটেড জেন্ডার বেইসড ভায়োলেন্স অ্যান্ড প্রোমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত হয়। প্রকল্পটি নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ) কর্মসূচির অংশ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এতে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে জিএফএ কনসালটিং গ্রুপ এবং অর্থায়ন করছে সুইজারল্যান্ড সরকার ও গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা।
আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন,এই কর্মশালা টিএফজিবিভি প্রতিরোধে গণমাধ্যমের ইতিবাচক, দায়িত্বশীল ও মানবিক ভূমিকা আরও সুদৃঢ় করবে।
Leave a Reply