হাসান হৃদয়
দৈনিক দক্ষিণের অপরাধ সংবাদ
১ ডিসেম্বর ১৯৭১। ভোরের ঘন অন্ধকারে সিলেটের ছাতকের ধলাই বিওপিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের এক দুর্বার বাহিনী—জেড-ফোর্সের ব্র্যাভো কোম্পানি। আর সেই কোম্পানির নেতৃত্বে ছিলেন ভোলার গর্ব, অদম্য বীর, মেজর (তৎকালীন ক্যাপ্টেন) হাফিজ উদ্দীন বীর বিক্রম।
ধলাই ছিল পাকিস্তানিদের এক অভেদ্য দুর্গ—৪৫০-৫০০ পাকসৈন্য, মর্টার, রিকয়েলেস গান, এমএমজি… এক ভয়ঙ্কর প্রতিরক্ষা বেষ্টনী।
অন্যদিকে ব্র্যাভো কোম্পানির ছিল মাত্র ৩৫০-৪০০ তরুণ যোদ্ধা, কয়েকটি লাইট মেশিনগান ও দু’টি ৩-ইঞ্চি মর্টার। কিন্তু তাদের ছিল আরেক অস্ত্র—বাংলাদেশের প্রতি অটল ভালোবাসা এবং বিজয়ের শপথ।
ভোর ৪:৪৫—চার কোম্পানি ধলাই ঘিরে ফেলল। কুয়াশায় হাতের দূরত্বও দেখা যায় না। সকাল ৬টায় হানাদারদের বাঙ্কারের দিকে ছুটে যায় ব্র্যাভো কোম্পানি। শুরু হয় এক ভয়ংকর সম্মুখযুদ্ধ—হাতে-হাতে লড়াই, বাঙ্কার ভেদ, টানা এমএমজি ফায়ার… তবুও মুক্তিযোদ্ধারা থামেনি।
যুদ্ধের উত্তাপে ২২ জন যোদ্ধা শহীদ হওয়া সত্ত্বেও সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে মনোবল ভাঙতে দেননি ক্যাপ্টেন হাফিজ।
দক্ষিণ দিক থেকে চার্লি কোম্পানি পিছিয়ে গেলে তিনি নিজেই দৌড়ে গিয়ে আবার তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে ফেরান। তিনি জানতেন—ধলাই না নিলে সিলেটের পথ বন্ধ।
বেলা ৩টার দিকে শত্রুর কমান্ড পোস্টের দিকে আক্রমণ পরিচালনা করতে গিয়ে ১২০ মিমি মর্টারের শ্যাপনেলে তাঁর ডান পা ও বাঁ হাত ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। রক্তে ভিজে যায় ইউনিফর্ম। অর্ডারলি তাঁকে সরিয়ে নিতে চাইলে তিনি উল্টো তাঁর এলএমজি কেড়ে নিয়ে গর্জে ওঠেন“ধলাই দখল না করে কেউ পিছু হটবে না। এই কথাই হয়ে ওঠে ব্র্যাভো কোম্পানির জয়ের শপথ।
সন্ধ্যা ৬টায় মুক্তিযোদ্ধারা ভেদ করে শেষ বাঙ্কারটি। পাকিস্তানি কমান্ডার সাদা পতাকা তোলে। রাত ৮টায় ধলাই পুরোপুরি হানাদারমুক্ত হয়।
এই যুদ্ধে ৬৮ জন শহীদ ও ১২০ জন আহত হন। পাকবাহিনী ফেলে যায় ২২০-এর বেশি লাশ, ১৮৭ জন সৈন্য আত্নসমর্পণ করে।
রক্তাক্ত পা নিয়েও মেজর হাফিজ উদ্দীন ধলাই বিওপির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন—
এটাই ছিল সিলেট-মুক্তির দ্বার খুলে দেওয়া সেই ঐতিহাসিক বিজয়। এবং তাঁর অসামান্য বীরত্বের জন্যই দেওয়া হয় বীর বিক্রম উপাধি।
আজ আমরা গর্ব করে বলি—
আপনি আমাদের ব্র্যাভো কমান্ডো।আপনি আমাদের বিজয়ের প্রতীক।বীর বিক্রম মেজর হাফিজ উদ্দীন—বাংলার অমর সন্তান।
Leave a Reply