
মোঃ আশরাফ ইকবাল পিকলু মাজমাদার
খুলনা বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান।
কুষ্টিয়ায় সার সংকটে বিপাকে পেঁয়াজ চাষিরা, গেল বছর পেঁয়াজের বাজারদর কৃষকদের মুখে হাসি ফোটালেও চলতি মৌসুমে সেই হাসিতে ভাঁজ ফেলেছে সারের সংকট। ভালো দামের আশায় কুষ্টিয়ার কুমারখালীসহ বিভিন্ন উপজেলায় পেঁয়াজ আবাদে আগ্রহ বাড়িয়েছেন চাষিরা। মৌসুমের শুরুতে ৩৫–৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া পেঁয়াজ কয়েক মাস আগেও ১২০ থেকে ১৩৫ টাকা কেজিতে হাতবদল হয়েছে। বর্তমানে বাজারে ৮৫–৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও উৎপাদন খরচ ২২–২৫ টাকা হওয়ায় লাভের হিসাবই ছিল চাষিদের ভরসা। কিন্তু মাঠে নেমে সেই ভরসায় চোরাবালির মতো ঢুকে পড়েছে সারের অপ্রাপ্যতা ও বাড়তি দাম।
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারদের সিন্ডিকেটের কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী নন-ইউরিয়া—টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি—সার মিলছে না। আবার কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি দিলেই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সার সরবরাহ করছেন। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন পেঁয়াজ চাষিরা।
কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় মোট কৃষিজমির পরিমাণ ১৮ হাজার ২৪০ হেক্টর। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৯২০ হেক্টর। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৩ হাজার ৬৯০ হেক্টরে চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। বছরজুড়ে ভালো দাম পাওয়ায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হবে বলে আশাবাদী কৃষি বিভাগ। তবে বাস্তবতায় জমি ভাড়া, বীজ, সার, চাষ ও পরিচর্যা মিলিয়ে হেক্টরপ্রতি খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় দেড় লাখ টাকা—যেখানে সারের প্রাপ্যতা অনিশ্চিত।
সরেজমিনে যদুবয়রা,পান্টি,বাগুলাট,নন্দলালপুর ও চাপড়া ইউনিয়নের মাঠে দেখা যায়, ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ২০–৩০ জনের দল বেঁধে চারা রোপণে ব্যস্ত কৃষক, শ্রমিক ও শিক্ষার্থীরা। ভরা মৌসুমে শ্রমিক সংকট থাকায় শিক্ষার্থীদের কেউ নিজের জমিতে,কেউ আবার দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন।
পান্টি ইউনিয়নের ভালুকা গ্রামের লাল্টু আলী শেখ বলেন, গেল বছর ভালো দাম পেয়েছি বলেই পেঁয়াজে ঝুঁকেছি। কিন্তু চাহিদামতো সার না পেয়ে বিপদে পড়েছি।
ভালুকা পূর্বপাড়ার তৌহিদুল ইসলাম জানান, “ডিলার লাইনে দাঁড় করিয়ে ন্যায্যমূল্যে ১০–২০ কেজির বেশি সার দেয় না। সাব ডিলাররা বস্তা ধরে দেয় ঠিকই, তবে বস্তাপ্রতি ৫০০–৭০০ টাকা বেশি নেয়। ভবিষ্যতে সার না পাওয়ার আশঙ্কায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছা জানান তিনি।
যদুবয়রা ইউনিয়নের বরইচারা গ্রামের আবু বাদশা বলেন, বিঘাপ্রতি ৪০–৫০ হাজার টাকা খরচে ৬০–৭০ মণ পেঁয়াজ পাওয়া যায়। লাভ আছে, কিন্তু সার না পেলে সেই লাভই ঝুঁকিতে।
লক্ষ্মীপুর গ্রামের আক্কাস আলী মোল্লার কণ্ঠে হতাশা, “বেশি দামে সার কিনে চাষ করতে গিয়ে খরচ বাড়ছে। সরকার যেন দ্রুত ব্যবস্থা নেয়।
একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, সরকারি দামে এক হাজার ৩৫০ টাকা বস্তা টিএসপি ১ হাজার ৮৫০ থেকে ২ হাজার টাকায়, এক হাজার ৫০ টাকা বস্তা ডিএপি ১ হাজার ৪৫০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় এবং এক হাজার টাকা বস্তা এমওপি ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে খোলাবাজারে।
কৃষকদের অভিযোগ আংশিক স্বীকার করে কুষ্টিয়া বিসিআইসি সার ডিলার সমিতির সভাপতি খন্দকার আব্দুল গাফফার বলেন,চাহিদা অনুযায়ী সরকার সার দিচ্ছে না। তবে ডিলাররা অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছে—এ অভিযোগ ঠিক নয়। সাব ডিলার ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
অন্যদিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাইসুল ইসলাম সারের সংকটের কথা অস্বীকার করে বলেন,ন্যায্যমূল্যে লাইনে দাঁড় করিয়ে সার দেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগে ইতোমধ্যে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার আশ্বাস দিয়ে বলেন, “সিন্ডিকেটের প্রমাণ মিললে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষকরা যেন সরকারি দামে ও চাহিদা অনুযায়ী সার পান,প্রশাসন সে লক্ষ্যেই মাঠে আছে।
ভালো ফলনের স্বপ্ন বুকে নিয়ে যে কৃষক মাঠে নামেন, সারের অভাবে সেই স্বপ্ন যেন ঝাপসা না হয়—এটাই এখন কুষ্টিয়ার পেঁয়াজ চাষিদের নীরব আর্তি।
প্রকাশক ও সম্পাদক : বাহাদুর চৌধুরী মোবাইল: ০১৩২৩০০২৩৭৭
সহসম্পাদক : মেহেদী হাসান হৃদয় মোবাইল:০১৬১০০৯৩৬২২
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যলয়ঃ চৌধুরী কমপ্লেক্স, চেয়ারম্যান বাজার, চরফ্যাশন, ভোলা ।
মোবাইলঃ০১৩২৩০০২৩৭৭ ইমেইলঃ mh01610093622@gmail.com T.L.No:183 T.I.N:534926870539