
আওরঙ্গজেব কামালঃ
দেশজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে কিন্ডারগার্টেন ও প্রি-ক্যাডেট নামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সরকারি নীতিমালা ও অনুমোদনের তোয়াক্কা না করেই ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠছে এসব স্কুল। শিক্ষা দেওয়ার আড়ালে অনেক ক্ষেত্রে এগুলো পরিণত হয়েছে খোলামেলা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। বিশেষ করে ঢাকা জেলার সাভার–আশুলিয়াসহ আশপাশের এলাকায় এ প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আর এই সব স্কুলগুলি বছরের শুরুতে ভর্তি বানিজ্যে মেতে উঠেছে। এই সব স্কুলের বিরুদ্ধে নিজ স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী প্রতি বছর ভর্তি করে হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। এ থেকে শিক্ষা ব্যবস্থা যেন বানিজ্যে পরিনত হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, হাতে গোনা কয়েকটি কিন্ডারগার্টেনই কেবল অনুমোদন পেয়েছে। অথচ বাস্তবে হাজার হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ছোট পরিসরে শুরু হলেও অনেক প্রতিষ্ঠান এখন নিজেদের নামের সঙ্গে “স্কুল অ্যান্ড কলেজ” যুক্ত করে মাধ্যমিক এমনকি উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পাঠদান করছে—যা সম্পূর্ণ বেআইনি। অনুমোদিত কিন্ডারগার্টেনের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের বিধান থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।
তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে ভর্তি বাণিজ্য ও আর্থিক শোষণ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগী এক অভিভাবক জানান, তার সন্তান একটি প্রি-ক্যাডেট স্কুলে পড়লেও প্রতি বছর নতুন করে ভর্তি দেখিয়ে ভর্তি ফি আদায় করা হয়। শিক্ষার্থী বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও পরের শ্রেণিতে উঠতে আবার ভর্তি হতে হয়। এতে প্রতিবছর বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এমন অভিযোগ শুধু একজনের নয়—অসংখ্য অভিভাবক একই অভিজ্ঞতার কথা বলছেন। ইচ্ছেমতো ভর্তি ফি, মাসিক বেতন, পরীক্ষার ফি, উন্নয়ন ফি, বই ও ইউনিফর্মের নামে অর্থ আদায় এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। কোনো ধরনের নির্দিষ্ট নীতিমালা বা নজরদারি না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান অভিভাবকদের অসহায় অবস্থাকে পুঁজি করে নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানাযায়, অযোগ্য শিক্ষক ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এ সব স্কুল চলছে। প্রশাসন দেখেও না দেখার ভাব করেন। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসব কিন্ডারগার্টেনের বড় অংশে নেই প্রশিক্ষিত শিক্ষক। অনেক ক্ষেত্রে কলেজ পড়ুয়া বা সদ্য পাশ করা তরুণ-তরুণীদের চুক্তিভিত্তিকভাবে কম বেতনে নিয়োগ দিয়ে ক্লাস ও পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষক বদল নিয়মিত ঘটনা হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে না। অন্যদিকে বহু প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে ঘিঞ্জি, অস্বাস্থ্যকর ভবনে। খেলার মাঠ, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট—এসবের কোনো নিশ্চয়তা নেই। অথচ কোমলমতি শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠার কথা সবচেয়ে যত্নবান পরিবেশে। এবিষয় আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অনুমোদন না থাকলেও এসব কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করানো হচ্ছে অন্য অনুমোদিত স্কুলের নামে। এভাবে ভুয়া রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে পরীক্ষায় বসানো হচ্ছে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে। অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বহু এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থী সংকট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে অনুমোদনহীন কিন্ডারগার্টেন থেকে শিক্ষার্থী “ধার” নেয়। বিনিময়ে চলে আর্থিক লেনদেন। এই ব্যবস্থাকে সংশ্লিষ্টরা ‘ফিডিং স্কুল’ নামে চিহ্নিত করে থাকে। শুধু মিরপুর এলাকাতেই এমন অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বের কথা জানা গেছে। সাভার ও আশুলিয়ায় এর সংখ্যা আরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনভিজ্ঞ শিক্ষক, মানহীন পাঠ্যক্রম ও দুর্বল তদারকির কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে পড়া শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে তারা উচ্চ শ্রেণিতে উঠে টিকতে না পেরে ঝরে পড়ছে। শিক্ষাজীবনের শুরুতেই ভুল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৬০ হাজারের বেশি এমন বেসরকারি ও অননুমোদিত কিন্ডারগার্টেন ও প্রি-ক্যাডেট স্কুল গড়ে উঠেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, যেখানে প্রায় দুই কোটির মতো শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। প্রাথমিক শিক্ষার জন্য গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় গোটা শিক্ষাব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। শিক্ষাবিদদের মতে, অবিলম্বে কিন্ডারগার্টেন ও প্রি-ক্যাডেট স্কুল পরিচালনায় স্পষ্ট আইন, নিবন্ধন বাধ্যবাধকতা এবং নিয়মিত তদারকি কার্যকর করতে হবে। অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা, ভুয়া রেজিস্ট্রেশন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিভাবকদের সচেতন করা জরুরি। অন্যথায় কিন্ডারগার্টেনের নামে চলতে থাকা এই লাগামহীন শিক্ষাবাণিজ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে একটি দুর্বল ও বিভ্রান্ত প্রজন্ম তৈরি করবে—যার দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না।
Publisher & Editor: Bahadur Chowdhury
Mobile: 01323002377
Editorial & Commercial Office: Chowdhury Complex, Chairman Bazar, Char Fasson, Bhola
Mobile: 01323002377
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি অনুমতি ছাড়া কপি করা নিষেধ।