
মোঃ তুহিন ফরাজী প্রতিনিধি ভোলা জেলা
বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে আরও একটি মর্মান্তিক ঘটনা দেশবাসীকে গভীর শোক ও উদ্বেগে ফেলেছে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও আলোচিত রাজনৈতিক সংগঠক শরীফ ওসমান হাদি (হাদি) গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর মৃত্যু শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মীর জীবনাবসান নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
গত ১২ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর বিজয়নগর–পল্টন এলাকায় একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হন হাদি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, খুব কাছ থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। এতে মুহূর্তের মধ্যেই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে তাঁকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়।
দীর্ঘ কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে ১৮ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ৯টার দিকে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শরীফ ওসমান হাদি। তাঁর মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় শোকবার্তা ও প্রতিবাদের ঝড়।
শরীফ ওসমান হাদি ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং তরুণ রাজনীতিকদের মধ্যে একজন পরিচিত মুখ। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্দোলন, সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী ও আপসহীন একজন সংগঠক। গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক সংস্কারের পক্ষে সোচ্চার অবস্থানের কারণে তিনি বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন মহলের সমালোচনার মুখে পড়েন। ফলে তাঁর হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে কেউ কেউ ধারণা করছেন, যদিও বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন।
হাদির মৃত্যুর পরপরই বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করে। তারা এই ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যা’ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে দোষীদের গ্রেপ্তার ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানায়।
অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকেও শোক প্রকাশ করা হয়েছে এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
হাদির মৃত্যু সাধারণ মানুষের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন—“ভিন্নমতের রাজনীতি করলে কি প্রাণ দিতে হবে?” তরুণ সমাজ বিশেষভাবে ক্ষুব্ধ ও হতাশ। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এদিকে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার টবগী ইউনিয়নে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হাদির হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে জুম্মার নামাজ শেষে টবগী রাস্তামাথা জামে মসজিদ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। এতে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন মাওলানা মহিউদ্দিন শরীফ। তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং দেশবিরোধী অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে। তিনি দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।
হাদির পরিবারও দ্রুত বিচার ও ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছে। তাঁর স্ত্রী ও স্বজনরা বলেন, “আমরা প্রতিশোধ চাই না, আমরা ন্যায়বিচার চাই।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবার বা একটি দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়বে।
শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরও একটি বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে রইল। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সহিংসতা কোনো সমাধান নয়—এই সত্য আবারও স্মরণ করিয়ে দিল তাঁর মৃত্যু। এখন দেশবাসীর প্রত্যাশা, হাদির রক্ত যেন আরেকটি সংখ্যায় পরিণত না হয়; দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপই পারে এই মৃত্যুকে অর্থবহ করে তুলতে।
প্রকাশক ও সম্পাদক : বাহাদুর চৌধুরী মোবাইল: ০১৩২৩০০২৩৭৭
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যলয়ঃ চৌধুরী কমপ্লেক্স, চেয়ারম্যান বাজার, চরফ্যাশন, ভোলা ।
মোবাইলঃ০১৩২৩০০২৩৭৭'''' T.L.No:183 T.I.N:534926870539