
দৈনিক দক্ষিণের অপরাধ সংবাদ
বিশেষ প্রতিনিধি
মোঃ শাহিন হাওলাদার
অতিবৃষ্টি, নদী ভাঙন, লবনাক্ততা ও জলাবদ্ধতায় নাকাল খুলনার উপকুলের কৃষিজীবীরা। সর্বশেষ টানা বর্ষনে শুধু খুলনায় ফসল,সবজি ও আমনের বীজতলা নষ্ট হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৩ সস্ত্রাধীক কৃষক। এমন সময় অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা মোকাবেলায় চলতি আমন মৌসুমে ভাসমান ধানের বীজতলা তৈরিতে সফলতা পেয়েছেন খুলনার এক কৃষক পরিবার।
চলতি বর্ষা মৌসুমে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতে কয়েক দফা বীজ নষ্ট হওয়ার এ ব্যতিক্রম উদ্যোগ নিয়ে অনেকটাই সফল হয়েছেন পাইকগাছা উপজেলার নোয়াকাটি গ্রামের কৃষক রোকেয়া পারভীন। এমন অবস্থায় দেবর আব্দুল কুদ্দুসকে নিয়ে ফেলে দেওয়া কলাগাছ, বাঁশ, মাটি ব্যবহার করে তৈরি বীজতলা এখন দুর্যোগ কবলিত কৃষকদের আশার আলো দেখাচ্ছে।
কৃষক রোকেয়া পারভীন বলেন, বৃষ্টির জন্য কয়েকদফায় প্রায় ১০০ কেজি বীজ ধান নষ্ট হয়ে গেছে। কোন কুল কিনারা পাচ্ছিলাম না, অ্যাওসেডর কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে কলা গাছের ভেলা বানিয়ে কাদা মাটি তুলে ব্রি-৭৫ আমন ধানের বীজ ফেলছি। একটি বীজও নষ্ট হয়নি। বরং মাত্র ১৫ দিনে চারা রোপনের মতো হয়েছে।
এখন আশপাশের কৃষকরা আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এবছর আমন রোপনে দেরি হয়েছে, সামনে আর সমস্যা হবে না। দুর্যোগের জন্য আর বীজতলা তৈরির জন্য বসে থাকতে হবে না। রোকেয়ার দেবর আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ১২ থেকে ১৩ বছর আগে বড় ভাই আবুল মোড়লের মৃত্যুর পর ভাবী ( রোকেয়া) সার্বক্ষনিক আমাদের কৃষি কাজে উৎসাহ দেন। কলা গাছের ভেলার বীজতলার কথা শুনে তিনি সবকিছু গুছিয়ে দেন।
প্রথমে আমাদের কাজ দেখে সবাই পাগল বলতো। বলতো কলা গাছের ভেলায় ধান হলেতো কারো জমি দরকার ছিল না। কিন্তু এখন সবাই অবাক। এখানে কোন সার কীটনাশক লাগেনি। জমিতেও এমন ধানের চারা আর কখোনো হয়নি। শুধু আমরা না, গ্রামের সবাই খুশি। সোয়াকাটি গ্রামের কৃষক কবির মোড়ল বলেন, মাত্র ১০ দিনে ৩/৪ ইঞ্চি ধনের চারা বিশ্বাস হচ্ছে না।
অথচ আমার বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষক আব্দুল্লাহ মোড়ল জানান, চলতি আমন মৌসুমে বৃষ্টির কারনে একমাস দেরি হয়েছে। সামনে আর সমস্যা হবে না। কলার ভেলা বা প্লাস্টিকের ড্রামের মাধ্যমে মাচা তৈরি করে ধানের বীজতলা তৈরি করা যাবে। এতে সার কীটনাশকের ব্যবহার করতে হচ্ছে না। এই পদ্ধতি বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিলে কৃষক উপকার পাবে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অটোক্রাফ কর্মকর্তা রুহুল আমিন বিস্ময় প্রকাশ করেন, তিনি বলেন কলা গাছের ভেলায় ধানের বীজতলা কৃষকদের স্বপ্ল দেখাবে। ভাসমান ভেলায় ধানের বীজতলা তৈরিতে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেছেন, অ্যাওসেডর কমিউনিটি মোবালাইজার শুভংকর বিশ্বাস নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ২০ বছরের মধ্যে এ বছর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এতে পাইকগাছা সহ খুলনা অঞ্চলে আমনের বীজতলা কয়েকবার নষ্ট হয়ে যায়। এ অবস্থা থেকে ভাসমান বীজতলা তৈরির বিষয়টি ভাবনা, যা কৃষকরা সফল বাস্তবায়ন করেছেন।
আগামী দিনে ভাসমান ভেলা জলাবদ্ধতা অঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন দেখাবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী এ বছর ৫ জুলাই থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত টানা বৃষ্টির কারনে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ৫৭৫ হেক্টর বীজতলার মধ্যে ১০৬ হেক্টর আমন বীজতলা নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে ৫৩ হেক্টর জমিই পাইকগাছায়। খুলনায় ২০.৮৭০ হেক্টর ফসলের মধ্যে সম্পুর্ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮৪৮ হেক্টর। ১৩ হাজার ৭১ জন কৃষকের আর্থিক ক্ষতির পরিমান ২৭ কোটি ৬৫ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।
পাইকগাছা ক্লাইমেট জাস্টিস ফোরামের সভাপতি অধ্যক্ষ রমেন্দ্রনাথ সরকার বলেন আমি ভাসমান বীজতলাটি দেখেছি। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আমাদের কৃষক দম্পত্তির এমন উদ্যোগ নি: সন্দেহে আশাব্যাঞ্জক। তাদের এ সফলতা শুধু খুলনাই নয়, সারা দেশের মানুষের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। ভাসমান বীজতলা সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের বার বার বীজ ক্রয়ে আর্থিক ক্ষতি লাঘব হবে।
পাশাপাশি মৌসুমের শুরুতে দুর্যোগ মোকাবেলা করে ধান চাষ করতে পারবেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার উপ পরিচালক নজরুল ইসলাম বলেন এটি ভালো উদ্যোগ। কৃষকের ঝুকি কমাতে উঁচু স্থানে বা ভেলা বা বিকল্পভাবে বীজতলার ব্যবস্থা করতে হবে। যা তাদের ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে।
Publisher & Editor: Bahadur Chowdhury
Mobile: 01323002377
Editorial & Commercial Office: Chowdhury Complex, Chairman Bazar, Char Fasson, Bhola
Mobile: 01323002377
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি অনুমতি ছাড়া কপি করা নিষেধ।