মোঃ অনিকুল ইসলাম উজ্জ্বল
১৯৭১ সাল, যুদ্ধের ঠিক আগ মহূর্তে সপরিবারে ২ মাসের ছুটিতে এসেছেন নিজ মাতৃভূমিতে। তিনি দেখতে পেলেন বাংলার মানুষের উপর নিপীড়ন অত্যাচার চালানো হচ্ছে। একের পর এক অসহায় বাঙ্গালিকে হত্যা করছে তৎকালীন পাকিস্তানি বাহিনী।
২৫ মার্চের কালরাতে তিনি ছিলেন তাদের গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরের রামনগর গ্রামে। হানাদারদের পৈশাচিক গণহত্যা দেখে আর তিনি স্থির থাকতে পারলেন না। ভাবলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কিছু করার।
তখন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হওয়া সত্ত্বেও অসীম ঝুঁকি ও সাহসিকতার সঙ্গে ভৈরবে একটি ট্রেনিং ক্যাম্প খুললেন। তিনি যুদ্ধ করতে আসা বাঙালি যুবকদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা অস্ত্র দিয়ে গড়ে তুললেন একটি প্রতিরোধ বাহিনী।
১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বিমান বাহিনী 'সেভর জেড' বিমান থেকে তাদের ঘাঁটির ওপর বোমাবর্ষণ করে। বিমান আক্রমণ শেষে তিনি সবার উদ্দেশে বলেছিলেন, 'বিমান থেকে ভৈরবে বোমাবর্ষণ হয়েছে। পাকিস্তানি যে পাইলটরা আমাদের উপর বোমাবর্ষণ করছে তাদের অনেকেই হয়তো আমার ছাত্র।
তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে উচ্চস্বরে আরও বলতে লাগলেন, "আমারই ছাত্র আজ আমার মাথায় বোমা ফেলছে। আমার বাংলাকে রক্তাক্ত করছে। মাটি হাতে নিয়ে বলেছি, 'আমার নিজের মাটির মর্যাদা আমি রাখবই। আমি পাইলট। আমার চাই যুদ্ধবিমান। একটা বিমান পেলে তাদের দেখিয়ে দিতাম।
৯ মে সপরিবারে করাচি ফিরে যান। যদিও দুই মাসের ছুটিতে এসে চার মাস পেরিয়ে গেছে ততদিনে। করাচি পৌঁছে লক্ষ্য করেন বাঙালি অফিসারদের সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। তাকেও তার নিজের দায়িত্ব না দিয়ে দেওয়া হলো ফ্লাইট সেফটি অফিসারের দায়িত্ব। মতিউর রহমানের চিন্তা তখন কেবল একটি বিমানের। তিনি পরিকল্পনা শুরু করেন। সহকর্মীদের সঙ্গে স্বাভাবিক ব্যবহার করছেন আর খুঁজছেন সুযোগ।
বাঙালি পাইলটদের আকাশে উড্ডয়নের অনুমতি বাতিল করা হয়। তখন করাচির মাশরুর বিমান ঘাঁটির বেস ফ্লাইট সেফটি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় মতিউর রহমানকে। অথচ এর আগে তিনি ছিলেন ফ্লাইট ইন্সট্রাকটর তথা বিমান প্রশিক্ষক। ছাত্রদের বিমান চালনার প্রশিক্ষণ দিতেন তিনি। তার অনেক পাকিস্তানি ছাত্রের একজনের নাম রশিদ মিনহাজ। রশিদ মিনহাজ পুরাতন ছাত্র বলে বুঝেছিলেন সে (মিনহাজ) একা আকাশে উড্ডয়নের অনুমতি পাবে। তাই তাকেই টার্গেট করেছিলেন মতিউর রহমান।
২০ আগস্ট ১৯৭১, শুক্রবার।
ফ্লাইট শিডিউল অনুযায়ী মিনহাজের উড্ডয়ন আজ। মতিউর পূর্ব পরিকল্পনা মতো অফিসে এসে সঠিক সময়ে গাড়ি নিয়ে চলে যান রানওয়ের পূর্ব পাশে। সামনে পিছনে দুই সিটের প্রশিক্ষণ বিমান টি-৩৩ যুদ্ধ বিমান। রশিদ মিনহাজ বিমানের সামনের সিটে বসে স্টার্ট দিয়ে এগিয়ে নিয়ে আসছে। এবার মতিউর রহমানের পালা। মতিউর রহমান হাত তুলে বিমান থামালেন। হাতের ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করলেন, বিমানের পাখায় সমস্যা। রশিদ মিনহাজ বিমানের 'ক্যানোপি' খুলতেই তাকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে ফেলে বিমানের পেছনের সিটে লাফিয়ে উঠে বসলেন মতিউর রহমান। কিন্তু জ্ঞান হারাবার আগে মিনহাজ বলে ফেললেন, 'আই হ্যাভ বিন হাইজ্যাকড'।
ছোট পাহাড়ের আড়ালে থাকায় কেউ দেখতে না পেলেও কন্ট্রোল টাওয়ার শুনতে পেল তা। বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতিউর রহমান বিমান নিয়ে ছুটে চললেন। রাডারকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য নির্ধারিত উচ্চতার চেয়ে অনেক নিচ দিয়ে বিমান চালাচ্ছিলেন তিনি। যদিও ততক্ষণে এফ-৮৬ যুদ্ধবিমান ও একটি হেলিকপ্টার তাকে ধাওয়া করা শুরু করে কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশে।
বিমানটি যখন ভারতীয় সীমান্তের দিকে যাচ্ছে তখন রশিদ মিনহাজের জ্ঞান ফিরে আসে এবং তিনি বাধা দিতে চেষ্টা করেন। সীমান্ত থেকে মাত্র দুই মিনিট দূরত্বে সিন্ধু প্রদেশের জিন্দা গ্রামে বালির ঢিবির ওপর আছড়ে পড়ে ব্লু বার্ড-১৬৬।
বিধ্বস্ত হয় টি-৩৩ যুদ্ধবিমান। মতিউর রহমানের সঙ্গে প্যারাসুট না থাকায় তিনি শহীদ হন। তার মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায় ঘটনাস্থল থেকে প্রায় আধা মাইল দূরে। বিমান ছিনতাইয়ের স্বপ্ন সফল হলো না।
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের কল্পনায় ছিল কীভাবে মুক্ত হবে মাতৃভূমি। তাই তো দেশের পানে ছুটে ছিলেন নিজের প্রাণ হাতে রেখে। নিজের জীবনকে বিলিয়ে গড়েছেন মাতৃভূমির প্রতি ভালবাসার নজিরবিহীন ইতিহাস।
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের মরদেহ দাফন করা হয়েছিল বিশ্বাসঘাতক হিসেবে। আর রশিদ মিনহাজ চিহ্নিত হয়েছিলেন জাতীয় বীর হিসেবে। ভূষিত হয়েছিলেন মরণোত্তর নিশান-ই-হায়দার খেতাবে। যা পাকিস্তানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। দীর্ঘ ৩৫ বছর শত্রুভূমি পাকিস্তানের মাটিতে তার কবর পড়েছিল অবহেলা আর অনাদরে।
একটু দূরেই ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের কবরের সামনে লেখা ছিল 'ইধার সো রাহা হ্যায় এক গাদ্দার' বা 'এখানে ঘুমিয়ে আছে এক বিশ্বাসঘাতক'।
আজ সেই ২০ আগষ্ট। মহান এই বীরের মৃত্যুবার্ষিকি আজ।
Publisher & Editor: Bahadur Chowdhury
Mobile: 01323002377
Editorial & Commercial Office: Chowdhury Complex, Chairman Bazar, Char Fasson, Bhola
Mobile: 01323002377
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি অনুমতি ছাড়া কপি করা নিষেধ।